
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মুহম্মদ শফিকুর রহমান বনানীর নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। হঠাৎ বাসভবনে স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর গুরুতর অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে প্রবীণ এই সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদের বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী ও সহকর্মী রেখে গেছেন। শফিকুর রহমান ভাই মারা গেছেন।
হাজার হাজার মাইল দূরে সুদূর অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসে যখন দৈনিক বঙ্গলোক পত্রিকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক লাবণ্য আপার কাছ থেকে প্রথম এই শোকের খবরটি পাই, মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কিছুতেই এই দুঃসংবাদটি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। প্রবাসের এই ব্যস্ত শহরে বসেও মনটা নিমেষেই ছুটে গেল ফেলে আসা সেই বাংলাদেশে, প্রেস ক্লাবের চেনা করিডোরে। পেশাগত জীবনের শুরু থেকে জড়িয়ে থাকা এক পরম শ্রদ্ধেয় অভিভাবকের চিরতরে চলে যাওয়ার খবরটি এভাবে দূর পরবাসে বসে শুনতে হবে—তা ছিল যেকোনো সাংবাদিকের জন্যই অত্যন্ত কঠিন, অপ্রত্যাশিত ও চরম বেদনাবিধুর ।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে মুহম্মদ শফিকুর রহমানের প্রশংসনীয় ভূমিকা চিরকাল সর্বজনবিদিত হয়ে থাকবে।
শফিক ভাই অনেক ধার্মিক ছিলেন। অনেকে তাকে মাওলানা শফিকুর হিসেবে চিনতেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের মসজিদে একসাথে নামাজ আদায় করতাম। রমজান মাসে তারাবির নামাজ জাতীয় প্রেসক্লাবের মসজিদে একসাথে পড়তাম। তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন । তবে তিনি তোষামোদি একেবারেই পছন্দ করতেন না এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশে চিরকাল আপোসহী কোমল। মানবতাই ছিল তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভূষণ।
মুহম্মদ শফিকুর ভাইয়ের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল আজ থেকে চার দশক আগে। ১৯৮৫ সালে আমি যখন ‘দৈনিক জনতা’ পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে আমার সাংবাদিকতা জীবন শুরু করি, তখন থেকেই তাঁর সাথে আমার পরিচয়। আমি তখন দৈনিক জনতায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিট কাভার করতাম। শফিক ভাই তখন কাজ করতেন দেশের ঐতিহ্যবাহী ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকায়।
রাজনৈতিক রিপোর্টিংয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে মাঠপর্যায়ে একসাথে খবরের পেছনে ছুটতে গিয়েই তাঁর সাথে আমার গভীর হৃদ্যতা ও পেশাগত সম্পর্কের বাইরে এক পরম আত্মিক বন্ধন গড়ে ওঠে। সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখার যে আপোসহীন জেদ তাঁর মধ্যে ছিল, তা তরুণ রিপোর্টার হিসেবে আমাকে প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করত। তিনি শুধু একজন প্রবীণ জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকই ছিলেন না, ছিলেন জুনিয়রদের আগলে রাখার মতো এক বটবৃক্ষ। আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সাংগঠনিক সফরকালে আমি আর শফিক ভাই এক রুমে থাকতাম। একবার সিলেটে আমি আর শফিক ভাই এক রুমে ছিলাম।
পেশাগত কাজের পাশাপাশি তাঁর সাথে আরেকটি আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়েছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের চত্বরে। আমরা কতদিন একসাথে জাতীয় প্রেস ক্লাবের মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেছি। নামাজের পর মসজিদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিংবা অজুখানায় কুশল বিনিময় করার সেই চিরচেনা দৃশ্যগুলো আজ স্মৃতির পাতায় বারবার ভেসে উঠছে। তাঁর সাথে কাটানো সেই আধ্যাত্মিক ও স্মৃতির মধুর মুহূর্তগুলো আজ বেদনার বড় চাবুক হয়ে বুকে আঘাত করছে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের দীর্ঘ ইতিহাসে মুহম্মদ শফিকুর রহমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিলেন। তিনি ১৯৮৩-৮৪ এবং ১৯৮৫-৮৬ মেয়াদে দুবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক এবং ২০১৫-১৬ ও ২০১৭-১৮ মেয়াদে নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ক্লাবের সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক পদের চেয়েও তাঁর বড় পরিচয় ছিল তিনি ক্লাবের সাধারণ সদস্যদের আপনজন ছিলেন। তিনি সবসময় প্রেস ক্লাবের ক্যান্টিনের বারান্দার কর্নারে তাঁর জন্য নির্ধারিত একটি চেয়ারটিতে বসতেন। সেটিই ছিল তাঁর চিরচেনা আড্ডার প্রাঙ্গণ, যেখানে বসলে জুনিয়র-সিনিয়র নির্বিশেষে সবার খোঁজ নিতেন অত্যন্ত স্নেহমাখানো কণ্ঠে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, তিনি আপনজনদের চিন্তে ভুল করতেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাইরে কিছু সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতেন। এর একটি বিশেষ কারণ ছিল তিনি নির্বাচন করতেন। একবার তিনি এক দুই ভোটে পরাজিত হন। মনে পড়ে খন্দকার মনিরুল আলম ও শফিক ভাইয়ের মধ্যে সমান ভোট হয়। আমাদের ফোরামের মোস্তাক আহমেদ মোবারকী ভাই শফিক ভাইকে ভোট দেয়নি। ওই থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের নির্বাচনে আমাদের ধস নামে জাতীয় প্রেসক্লাবে। শিক্ষাজীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর করা এই কৃতি মানুষটি ১৯৬৫ সাল থেকেই ছাত্ররাজনীতি ও পরে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি চাঁদপুর-৪ (ফরিদগঞ্জ) আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শফিক ভাই আজ আমাদের মাঝে নেই। তাঁর সেই স্বভাবসুলভ গম্ভীর কিন্তু পরম স্নেহশীল কণ্ঠস্বর আর কখনো প্রেস ক্লাবের করিডোরে প্রতিধ্বনিত হবে না। সিডনির এই দূর আকাশপানে তাকিয়ে ১৯৮৫ সালে রিপোর্টার জীবনের সেই শুরুর দিনগুলো এবং প্রেস ক্লাব মসজিদে একসাথে সেজদায় যাওয়ার স্মৃতিগুলো আজ মধুর বেদনার রঙ নিয়ে মনের কোণে ভিড় করছে। ক্লাবের শেষ দিনগুলোতে প্রিয় চেয়ারটি হারিয়ে যাওয়ার যে নীরব ক্ষত বুকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন, তা আমাদের বিবেককে আজীবন তাড়িত করবে। তিনি শিশু বাচ্চাদের আদর করতেন খুব ভালোভাবে। আপ্যায়ন করেছেন খুব আন্তরিকভাভ। আল্লাহ যেন শফিক ভাইকে মাফ করে দেন এই দোয়া করি।