
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভরতা কমাতে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইএসডিবি) সঙ্গে ১০০ কোটি ৪ লাখ ডলারের ঋণচুক্তি করতে যাচ্ছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপস্থিতিতে এ চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান উপস্থিত থাকবেন বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আইএসডিবি গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ সুলাইমান আল জাসের বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছেন।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণ প্রকল্পে আইএসডিবির ঋণ দুটি পৃথক অর্থায়ন সুবিধার আওতায় দেওয়া হবে। এর মধ্যে ‘ফরওয়ার্ড লিজ-১’ থেকে পাওয়া যাবে ৫২০ দশমিক ৫৯ মিলিয়ন ডলার এবং ‘ফরওয়ার্ড লিজ-২’ থেকে ৪৮৩ দশমিক ১০ মিলিয়ন ডলার। প্রথম সুবিধার আওতায় আরও ৬ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তা অনুদান দেওয়ার কথা রয়েছে।
ঋণের সুদহার ৫.৪৫ শতাংশ
তবে আইএসডিবির এই অর্থায়ন তুলনামূলক কঠিন শর্তের ঋণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঋণের মোট মার্কআপ হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ দশমিক ৪৪৬২৭ শতাংশ।
ইআরডির নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৫ জুলাই ছয় মাস মেয়াদি টার্ম সিকিউরড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেট (SOFR) ছিল ৩ দশমিক ৮৪৬২৭ শতাংশ। এর সঙ্গে ১ দশমিক ৬০ শতাংশ পয়েন্ট স্প্রেড ও ঝুঁকি প্রিমিয়াম যোগ করে মোট মার্কআপ হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর। এর মধ্যে প্রথম পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ড থাকবে। পরবর্তী ১৫ বছরে ছয় মাস অন্তর কিস্তিতে ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
ইআরডি জানিয়েছে, ঋণের ‘গ্রান্ট এলিমেন্ট’ ঋণ দুটির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১২ শতাংশ ও ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। এ কারণে অর্থায়নটিকে ‘হাইলি নন-কনসেশনাল’ বা অত্যন্ত কঠিন শর্তের ঋণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে ইআরডি।
তিন গুণ হবে পরিশোধন সক্ষমতা
ইস্টার্ন রিফাইনারির আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা ১৫ লাখ টন। আধুনিকায়ন ও দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ শেষে সক্ষমতা আরও ৩০ লাখ টন বাড়িয়ে মোট ৪৫ লাখ টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
অর্থাৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় তিন গুণ হবে। এতে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদার একটি বড় অংশ স্থানীয়ভাবে পূরণ করা সম্ভব হবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প ব্যয় ৩১ হাজার কোটি টাকা
ইস্টার্ন রিফাইনারি আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা।
এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন থাকবে ১৮ হাজার ৫৬৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ১২ হাজার ৪৩৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়কাল ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত।
এর আগে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি শর্তসাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। তখন প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা।
পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের পর প্রকল্পের ব্যয় ৪ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা কমিয়ে ৩১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তুলনামূলক উচ্চ ব্যয়ের এই ঋণ পরিশোধের বিষয়টিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক দায় তৈরি করবে।