News update
  • নেতানিয়াহুকে হটিয়ে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেন গাদি আইজেনকট     |     
  • মিরপুরে বাসে অগ্নিকাণ্ডের চেষ্টা, চালক-সহকারীর তৎপরতায় এড়ালো বড় দুর্ঘটনা     |     
  • পোল্যান্ডে বন্দুকধারীর গুলিতে ৬ জন নিহত, আহত ১৫     |     
  • ট্রাকচাপায় শিশুসহ একই পরিবারের তিনজনসহ নিহত ৪     |     
  • কোনো ষড়যন্ত্র দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষকে দমিয়ে রাখতে পারবে না : প্রধানমন্ত্রী     |     
আন্তর্জাতিক ডেস্ক জলবায়ু ও পরিবেশ 2026-11-08, 7:47am

পরিবেশ রক্ষায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে, বাড়ছে বিদ্যুৎ-পানির চাপও

a-i-poribesh-3e5a2d3526458d2e28dda344a84364721794102478.jpg


বন্য প্রাণী গণনা, দাবানল শনাক্ত ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়াচ্ছে বিশ্বের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। মাত্র কয়েক ঘণ্টায় ২ লাখ প্রাণীর ছবি বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে কয়েক দশকের গবেষণার হাতে লেখা নথি ডিজিটাল করা, সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এআই। তবে এই প্রযুক্তি পরিচালনায় ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারের বিপুল বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগের সামনেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন থেকে ৭ নভেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রযুক্তিটির ব্যবহার নিয়ে ১৫টি বড় পরিবেশ, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছে সংবাদমাধ্যমটি। সাক্ষাৎকার দেওয়া সব সংস্থাই জানিয়েছে, তারা কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটির পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টারগুলোতে বিপুলসংখ্যক সার্ভার ব্যবহৃত হয়। এসব সার্ভার চালাতে প্রচুর বিদ্যুৎ লাগে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখতে প্রয়োজন হয় বিপুল পরিমাণ পানি। ফলে পরিবেশ রক্ষায় ব্যবহৃত প্রযুক্তিই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানি ব্যবহারের মাধ্যমে নতুন পরিবেশগত চাপ তৈরি করছে।

মার্কিন অলাভজনক সংস্থা কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের এআইবিষয়ক প্রধান আলি সোয়ানসন বলেন, এআইয়ের পরিবেশগত ব্যয় থাকতে পারে, তাই এর ব্যবহারে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তবে জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংকট ক্রমেই তীব্র হওয়ায় সংগৃহীত তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রযুক্তিটি সহায়তা করছে।

সংস্থাটি কম্বোডিয়ার প্রত্যন্ত ও পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল বনাঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি শনাক্ত করতে এআই ব্যবহার করছে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া তাপীয় অস্বাভাবিকতা বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য দাবানলের বিষয়ে স্থানীয় বন টহল দলকে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠানো হচ্ছে। এতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

এআই ব্যবহারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ পাওয়া গেছে কেনিয়ার বন্য প্রাণী সংরক্ষণ সংস্থা ‘সেভ দ্য এলিফ্যান্টস’-এর কাজে। সংস্থাটি হাতির সংখ্যা নিরূপণ এবং তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ নিয়ে গবেষণায় মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।

সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী ফ্র্যাঙ্ক পোপ জানান, গত বছর কেনিয়ার সবচেয়ে বড় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি আকাশপথে জরিপ চালানো হয়। এতে প্রায় ২ লাখ ছবি সংগ্রহ করা হয়েছিল। এসব ছবি হাতে পর্যালোচনা করতে নয়জন গবেষকের প্রায় নয় মাস সময় লেগেছিল। কিন্তু এনভিডিয়ার জিফোর্স গ্রাফিকস প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত এআই মডেল একই ধরনের ছবি মাত্র কয়েক ঘণ্টায় বিশ্লেষণ করতে পারছে।

এতে শুধু কাজের গতিই বাড়েনি, প্রাণী গণনার নির্ভুলতাও বেড়েছে। পোপের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের মানবনির্ভর জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হাতি, অর্ধেক জেব্রা ও জিরাফ এবং প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ওরিক্সের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এআই ব্যবহারে এসব প্রাণীর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

পোপের মতে, প্রকৃতির সঠিক তথ্য পাওয়া গেলে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করাও সহজ হয়।

বিখ্যাত প্রাইমাটোলজিস্ট জেন গুডলের প্রতিষ্ঠিত জেন গুডল ইনস্টিটিউটও এআই ব্যবহার করে গবেষণায় বড় পরিবর্তন আনছে।

তানজানিয়ার গোম্বে ন্যাশনাল পার্কে শিম্পাঞ্জির আচরণ নিয়ে কয়েক দশক ধরে হাতে লেখা গবেষণার নথি সংরক্ষিত রয়েছে। এসব নথি স্থানীয় কিহা ভাষা ও বৈজ্ঞানিক সংক্ষিপ্ত সংকেতে লেখা। ফলে সেগুলো ডিজিটাল করা ছিল অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ।

আগে ধারণা করা হয়েছিল, পুরো প্রকল্প শেষ করতে ১৩ থেকে ১৫ বছর লাগবে। কিন্তু অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সহযোগিতায় তৈরি এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নথিগুলো স্ক্যান, অনুবাদ ও তথ্যভিত্তিক কাঠামোয় সাজানো হচ্ছে। এতে কাজটি শেষ করতে সময় কমে প্রায় দুই বছরে নেমে এসেছে।

প্রতিষ্ঠানটির সংরক্ষণবিষয়ক বিজ্ঞানের ভাইস প্রেসিডেন্ট লিলিয়ান পিন্টিয়া জানান, জেন গুডল জীবদ্দশায় সংরক্ষণবিষয়ক গবেষণায় এআই ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। তবে এ প্রযুক্তির ব্যবহারে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ওপর তিনি গুরুত্ব দিতেন।

সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও এআই ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য নেচার কনজারভেন্সি। মাছ ধরার নৌযানে এআই-চালিত ক্যামেরা বসিয়ে মাছ ধরার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এসব ক্যামেরা নৌযানেই ধারণ করা ভিডিও বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে বিপুল পরিমাণ ভিডিও দূরবর্তী ডেটা সেন্টারে পাঠানোর প্রয়োজন কমছে। এতে তথ্য স্থানান্তরের খরচের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপও কমানো সম্ভব হচ্ছে।

অন্যদিকে, ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব কমাতে অপ্রয়োজনীয় ভিডিও ও ছবি তৈরির মতো বিদ্যুৎনির্ভর কাজ সীমিত করছে। আগে বিশ্লেষণ করা তথ্য পুনরায় কাজে লাগানোর উদ্যোগও নিয়েছে সংস্থাটি।

পরিবেশ রক্ষায় এআইয়ের কার্যকারিতা স্বীকার করলেও ডেটা সেন্টারের বিস্তার নিয়ে আপত্তি রয়েছে গ্রিনপিসের। সংস্থাটির জলবায়ু ও জ্বালানি প্রচারক ক্যাটরিন শুয়েইং উ বলেন, অন্য সংস্থাগুলো কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে এআই ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে ভাবছে। কিন্তু গ্রিনপিসের প্রশ্ন হলো, আদৌ এত বিশাল ডেটা সেন্টার নির্মাণের প্রয়োজন আছে কি না।

জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর ওয়াটার, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হেলথের গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলোর সামগ্রিক পরিবেশগত পদচিহ্ন দ্বিগুণের বেশি হতে পারে। এর আয়তন ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার প্রায় দ্বিগুণের সমান হতে পারে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারগুলোর বার্ষিক বিদ্যুৎ ব্যবহার প্রায় ৯৪৫ টেরাওয়াট ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারে। এর ফলে ৩০ কোটি টনের বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইডের সমপরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হতে পারে। এ পরিমাণ বিদ্যুৎ জাপানের এক বছরের বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় সমান।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বড় এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব প্রকাশ্যে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে চলতি মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ টেকসই এআই ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পেতে পারে। সম্মেলনের আয়োজক দেশ হিসেবে তুরস্ক সরকার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সংস্থার কাছে পরিবেশবান্ধব এআই উন্নয়ন ও ব্যবহারের নীতিমালা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি চাইবে।

অ্যামাজন জানিয়েছে, কম কার্বন নিঃসরণকারী জ্বালানির ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ও পানির দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তাদের এআই পণ্যগুলোর পরিবেশগত প্রভাব কমানোর চেষ্টা চলছে। তবে এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে যোগাযোগ করা হলেও মাইক্রোসফট ও গুগল রয়টার্সকে কোনো জবাব দেয়নি।

ব্রিটিশ সংস্থা বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের প্রধান বিজ্ঞানী স্টুয়ার্ট বুচার্ট মনে করেন, পরিবেশ রক্ষায় সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে এআইয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া জরুরি। তার মতে, এ প্রযুক্তি কাজে না লাগালে পরিবেশ সংরক্ষণের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা কঠিন হয়ে পড়বে।

সব মিলিয়ে পরিবেশ রক্ষায় এআইয়ের ব্যবহার এখন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে প্রযুক্তিটির সুফল পেতে হলে এর বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডেটা সেন্টারের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করেই এআইকে টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

সূত্র: রয়টার্স