
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৫ সেন্টিমিটার বাড়লে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রায় ৪ শতাংশ ভূমি পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে প্রায় এক কোটি মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও জীবনযাত্রা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ সতর্কতার কথা জানান।
বিশ্বব্যাংকের একটি হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও মানবিক মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর পক্ষে এককভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তারেক রহমান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
এ ক্ষেত্রে তিনি চারটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
প্রথমত, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য ধরে রাখতে কার্বন নিঃসরণ দ্রুত, ব্যাপক ও ন্যায্যভাবে কমানোর আহ্বান জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমানযোগ্য ও সহজলভ্য জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
তৃতীয়ত, উপকূলীয় ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, তথ্য ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতি, ক্ষয়ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত বিষয় মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের কথা বলেন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন ও নিরাপদ পথ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
উপকূল রক্ষায় বাংলাদেশের উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শত শত নদী সাগরে মিশে যাওয়ায় বাংলাদেশ একটি সক্রিয় বদ্বীপ অঞ্চল। ফলে দেশের ভবিষ্যৎ ও সমৃদ্ধি উপকূলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, দেশে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং উপকূলীয় সুরক্ষায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খননের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি পানি সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগ এগিয়ে নেওয়া, মাস্টারপ্ল্যানের আওতায় তিস্তা ব্যারাজ আধুনিকায়ন এবং আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ একই সঙ্গে সবুজ প্রবৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সবুজ শিল্প ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পাশাপাশি জাতীয় কার্বন বাজার গড়ে তোলার কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে বন, জলাভূমি এবং ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় প্রতিবেশব্যবস্থা সুরক্ষায় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে শুধু অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ দিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিশ্বের প্রতিটি টন কার্বন নিঃসরণের প্রতিক্রিয়া সমুদ্রের ওপর পড়ে। তাই মানুষের ভোগের ধরন নতুন করে বিবেচনা করার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সমুদ্র দ্রুত উঁচু হচ্ছে, তাই বিশ্বের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কার্যক্রমকে তার চেয়েও দ্রুত এগিয়ে নিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান
বক্তব্যের শেষ দিকে তারেক রহমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি নিয়ে ঘোষণাপত্রে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তব কর্মসূচিতে রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিশ্বের দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করে ঘোষণাপত্রের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করবে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠীকে একা বিপদের মুখে পড়তে হবে না।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের পাশাপাশি আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।