News update
  • ‘সরকারের আশা বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায়ই শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে ভারত’     |     
  • সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর মুক্তির দাবি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ৩৫ সাংবাদিকের     |     
  • সৌদির সড়কে প্রাণ হারানো ৭ বাংলাদেশির পরিচয় জানা গে‌ল     |     
  • নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে পরীমনিকে আইনি নোটিশ     |     
  • শ্যামাপূজা ও দীপাবলি উৎসব আজ     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক প্রথম পাতা 2026-10-17, 7:13pm

অনিশ্চয়তা নিয়ে দুশ্চিন্তা নয়, স্বস্তিতে থাকার উপায়

8998988989-fa4257133c49dffba01ad69cf9b9f7181792242839.jpg


চাকরির আবেদন করে অপেক্ষা করছেন, চিকিৎসা পরীক্ষার ফল নিয়ে উদ্বিগ্ন কিংবা বসের অস্পষ্ট ই-মেইলের অর্থ বুঝতে পারছেন না? ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা না জানার কারণে মনে দুশ্চিন্তা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে অনিশ্চয়তাকে ভয় না পেয়ে তা মেনে নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে মানসিক স্বস্তি বাড়তে পারে বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব কুইবেক ইন আউটাওয়াইসের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক মিশেল ডুগাস বলেন, অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া সবার জন্য সহজ নয়। তবে রাজনীতি, প্রযুক্তি ও দৈনন্দিন জীবনে দ্রুত পরিবর্তনের কারণে এই চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে। অজানা পরিস্থিতির সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা সবারই প্রয়োজন।

ডুগাসের মতে, সম্পর্ক, স্বাস্থ্য ও আর্থিক অবস্থাসহ জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা রয়েছে। কী ঘটবে, তা না জেনেও স্বাভাবিকভাবে জীবন পরিচালনা করতে শেখা মানসিক সুস্থতা ও জীবনমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অনুশীলনের মাধ্যমে মানুষ শুধু অনিশ্চয়তা সহ্য করতেই নয়, বরং নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণ করতেও শিখতে পারে। কারণ সবকিছু আগে থেকে জানা থাকলে জীবন একঘেয়ে হয়ে উঠতে পারে।

কেন অনিশ্চয়তা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে?

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব রেজিনার মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিক কার্লেটনের মতে, অনিশ্চয়তা নিয়ে মানুষের অস্বস্তির মাত্রা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। পরিস্থিতির ওপরও এর প্রভাব নির্ভর করে।

ধরা যাক, একটি অনুষ্ঠানে বেলুন, বন্ধু ও কেকের মধ্যে মোড়কবন্দি একটি বাক্স পড়ে আছে। সেটি দেখে কারও মনে কৌতূহল ও আনন্দ তৈরি হতে পারে। কিন্তু একই ধরনের একটি বাক্স যদি জনমানবহীন অবস্থায় কোনো মেট্রোরেল স্টেশনে পড়ে থাকতে দেখা যায়, তাহলে সেটি ভয় ও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

অজানা বিষয় নিয়ে কিছুটা সতর্কতা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কার্লেটনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যারা অনিশ্চয়তার প্রতি অতিরিক্ত আকৃষ্ট হন, তারা বিপজ্জনক ঝুঁকি নিতে পারেন। অন্যদিকে, যারা অজানাকে অতিরিক্ত ভয় পান, তারা গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে পারেন। তাই অনিশ্চয়তা এড়িয়ে চলা কিংবা সব ঝুঁকি উপেক্ষা করা, কোনোটিই কার্যকর সমাধান নয়।

স্মার্টফোন কি অনিশ্চয়তা সামলানোর ক্ষমতা কমাচ্ছে?

স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা মানুষের অজানা পরিস্থিতি মোকাবিলার অভ্যাসে প্রভাব ফেলতে পারে। বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক হেলথের মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক গবেষক জেরন ভ্যান বার এবং তার সহকর্মীরা ১৯৯০-এর দশক থেকে পরিচালিত ১৩৭টি গবেষণা পর্যালোচনা করেন। এসব গবেষণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা সহ্য করার প্রবণতা একই পরিমাপক দিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছিল।

গবেষকেরা দেখতে পান, সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা অসহ্য মনে করার প্রবণতার গড় স্কোর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

এর সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহারকে বিবেচনা করা হয়েছে। এখন পথ হারানোর আশঙ্কা কমাতে নেভিগেশন অ্যাপ ব্যবহার করা যায়, দেরি হলে মুহূর্তেই অন্যকে জানানো যায়, আবার ছোটখাটো তথ্য নিয়ে বিতর্কেরও তাৎক্ষণিক সমাধান পাওয়া যায়।

ভ্যান বার বলেন, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মানুষ এখন প্রায় যেকোনো তথ্য দ্রুত জানতে পারে। ফলে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়েও যে স্বাভাবিকভাবে চলা সম্ভব, সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ কমে যেতে পারে।

তবে গবেষণার এই ফলাফল থেকে স্মার্টফোনই অনিশ্চয়তা অসহ্য হয়ে ওঠার একমাত্র কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

তাৎক্ষণিক উত্তর না পেয়েও স্বাভাবিক থাকুন

অনিশ্চয়তা নিয়ে অস্বস্তি যখন দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করার মতো উদ্বেগে পরিণত হয়, তখন পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করেন ডুগাস। চিকিৎসার অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পরিবেশে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়ার অনুশীলন করানো যেতে পারে।

ডুগাস এমন এক রোগীর উদাহরণ দিয়েছেন, যিনি পরীক্ষার ফল নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন থাকতেন। অনলাইনে ফল প্রকাশিত হওয়ার পরও তাকে সেটি দেখার আগে ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল।

শুরুতে ওই ব্যক্তি তীব্র অস্বস্তি অনুভব করলেও দ্বিতীয় দিনের মধ্যে তার উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। ডুগাসের ব্যাখ্যা, মানুষ যে পরিস্থিতিগুলোকে ভয় পায়, সেগুলোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই নতুনভাবে চিন্তা করা ও প্রতিক্রিয়া জানানো শিখতে পারে।

ছোট ছোট অনুশীলনের মাধ্যমেও এ অভ্যাস গড়ে তোলা সম্ভব। যেমন, অল্প সময়ের জন্য ফোন বাড়িতে রেখে বাইরে যাওয়া কিংবা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বারবার অন্যের আশ্বাস না চাওয়া।

ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক রায়ান জেন জ্যাকোবি বাস্তব কোনো সমস্যা দেখা দিলে সব অনিশ্চয়তা দূর করার তাড়না নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন।

ধরা যাক, ভ্রমণের পরিকল্পনায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রথমে বুঝতে হবে, সমস্যাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে আছে কি না এবং সমাধান করা সম্ভব কি না। সমাধান সম্ভব হলে তিন-চারটি বাস্তবসম্মত বিকল্প চিহ্নিত করে প্রতিটির সুবিধা ও অসুবিধা বিবেচনা করতে হবে। এরপর সবচেয়ে উপযুক্ত বিকল্পটি বেছে নিতে হবে।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বারবার সেটি সঠিক ছিল কি না, কিংবা অন্য বিকল্প বেছে নিলে আরও ভালো হতো কি না, তা নিয়ে চিন্তা না করাই ভালো। জ্যাকোবির মতে, প্রতিটি সিদ্ধান্তের নিখুঁত সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, কোনো পরিস্থিতি পরিবর্তন করা সম্ভব না হলে সমাধান খোঁজার চেষ্টা থেকে সরে এসে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। মনোযোগী শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন, ধ্যান কিংবা পছন্দের কাজে যুক্ত থাকা উদ্বেগ কমাতে এবং বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

শিশুর মতো কৌতূহল নিয়ে অপ্রত্যাশিত ঘটনাকে দেখুন

অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার অর্থ এই নয় যে বাস্তব বিপদ উপেক্ষা করতে হবে, হতাশাকে অস্বীকার করতে হবে কিংবা প্রতিটি খারাপ ঘটনাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বৌদ্ধ শিক্ষক পেমা চোড্রন তার কমফোর্টেবল উইথ আনসার্টেনটি বইয়ে অনিশ্চয়তাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলেছেন। তার বক্তব্যের মূল ভাব হলো, ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা পুরোপুরি জানা সম্ভব নয়; এই অজানার মধ্যেই জীবনের নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ রয়েছে।

কার্লেটনের পরামর্শ, নেতিবাচক আবেগকে অস্বীকার না করে অপ্রত্যাশিত ঘটনা থেকে নতুন কিছু শেখার সম্ভাবনার জন্য মন খোলা রাখা উচিত। প্রতিটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ভালো ফল বয়ে আনবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে ভিন্ন সম্ভাবনার প্রতি উন্মুক্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

জ্যাকোবি বলেন, অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটলে শিশুরা অনেক সময় ভয় পাওয়ার বদলে কৌতূহল ও আনন্দ প্রকাশ করে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড়রা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক নিয়ে বেশি ভাবতে শুরু করেন। এতে অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়তে পারে।

ডুগাসের মতে, মহাবিশ্ব ও জীবনের অনির্দেশ্য বৈশিষ্ট্য মেনে নেওয়া মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জীবনের অনিশ্চয়তা একেবারেই সহ্য করতে না পারলে সুখী হওয়া এবং ভালো জীবনমান বজায় রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা হলো, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বর্তমানকে দুশ্চিন্তায় কাটিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া, বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা বিষয়গুলো মেনে নেওয়ার অভ্যাস অনিশ্চয়তার মধ্যেও মানসিক স্বস্তি ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।