
উচ্চ রক্তচাপ বর্তমানে বিশ্বজুড়ে অন্যতম পরিচিত স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেকের ক্ষেত্রে রক্তচাপ বেড়ে গেলেও শুরুতে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা না করলে দীর্ঘদিন বিষয়টি অজানা থেকে যেতে পারে। অথচ অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ হৃদ্রোগ, স্ট্রোকসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে প্রথমেই খাবারের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই রান্নায় বাড়তি লবণ ব্যবহার, অতিরিক্ত লবণযুক্ত আচার, চিপস, চানাচুর ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব কম খাওয়া উচিত।
নিয়মিত হাঁটা ও ব্যায়াম
শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার বা অন্যান্য মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করা যেতে পারে। নিয়মিত শরীরচর্চা হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখতে এবং শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
অতিরিক্ত ওজন উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার চেষ্টা করা প্রয়োজন। ওজন বেশি হলে হঠাৎ কঠোর ডায়েটের পরিবর্তে ধীরে ধীরে খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনা ভালো।
খাবারের তালিকায় পরিবর্তন
উচ্চ রক্তচাপ ঠেকাতে প্রতিদিনের খাবারে শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, পূর্ণ শস্য ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার রাখা উচিত। একই সঙ্গে অতিরিক্ত চর্বি, অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চিনি ও লবণযুক্ত খাবার কমাতে হবে।
ধূমপান ও তামাক বর্জন
ধূমপান ও তামাকজাত পণ্য হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এগুলো উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই সুস্থ থাকতে ধূমপান ও তামাকের অভ্যাস পুরোপুরি বাদ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ কমানো
অনিয়মিত ঘুম ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত জীবনযাপন এবং মানসিক চাপ কমানোর জন্য হাঁটা, বই পড়া, প্রার্থনা বা পছন্দের স্বাস্থ্যকর কাজে সময় দেওয়া যেতে পারে।
নিয়মিত রক্তচাপ মাপুন
উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম সমস্যা হলো অনেক সময় এটি কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে। তাই বয়স ও স্বাস্থ্যঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করা জরুরি। রক্তচাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ওষুধে অনিয়ম নয়
যাদের ইতোমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়েছে এবং চিকিৎসক ওষুধ দিয়েছেন, তাদের নিয়ম মেনে ওষুধ সেবন করতে হবে। নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বন্ধ করা, ডোজ কমানো বা বাড়ানো ঠিক নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলোআপ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
কখন জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন
রক্তচাপ ১৮০/১২০ mmHg-এর বেশি হলে কিছুক্ষণ পর আবার রক্তচাপ মাপা উচিত। একই মাত্রায় বেশি থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে যদি বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, শরীরের কোনো অংশ দুর্বল বা অবশ হয়ে যাওয়া, দৃষ্টির পরিবর্তন কিংবা কথা বলতে অসুবিধার মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে তা জরুরি পরিস্থিতি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধের জন্য বড় কোনো পরিবর্তনের অপেক্ষা না করে আজ থেকেই ছোট ছোট স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার। কম লবণ, পরিমিত ও পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন, তামাক বর্জন, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা—এই অভ্যাসগুলোই হতে পারে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।