News update
  • যুক্তরাষ্ট্রকে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ইরানের     |     
  • কিশোর গ্যাং দমনে কুমিল্লায় সাঁড়াশি অভিযান: আটক ৬২৪     |     
  • এল নিনোর প্রভাবে ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা     |     
  • ভারতে স্লিপার বাসে ভয়াবহ আগুন, নিহত ৯     |     
  • বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে: মাহদী আমিন     |     
নিজস্ব প্রতিবেদক জাতীয় 2026-09-10, 7:29pm

‘মাননীয়’ বাদ, নিজের দপ্তর থেকেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরু প্রধানমন্ত্রীর

দাপ্তরিক নথিতে শুধু ‘প্রধানমন্ত্রী’; নিজেও দিচ্ছেন ডিজিটাল হাজিরা, প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বার্তা

tr-e7d707a26e7f7b6ff52c489c60e429b11789046984.jpg

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।


রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পদগুলোতে অপ্রয়োজনীয় সম্মানসূচক শব্দের ব্যবহার পরিহারের সিদ্ধান্ত নিজের দপ্তর থেকেই বাস্তবায়ন শুরু করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারি নথিপত্র ও দাপ্তরিক যোগাযোগে প্রধানমন্ত্রীর পদবির আগে ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার পাশাপাশি নিজেও ডিজিটাল হাজিরা দেওয়ার মাধ্যমে দাপ্তরিক শৃঙ্খলার নতুন বার্তা দিয়েছেন তিনি।


বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিভিন্ন নথি ও দাপ্তরিক কার্যক্রমে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ না লিখে শুধু ‘প্রধানমন্ত্রী’ লেখার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। একই সঙ্গে কার্যালয়ে প্রবেশ ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে ডিজিটাল হাজিরা দেওয়ার নিয়মও অনুসরণ করছেন প্রধানমন্ত্রী।


প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে প্রবেশের আগে প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল হাজিরা দেন। দিনের কাজ শেষে কার্যালয় ছাড়ার সময়ও নির্ধারিত পদ্ধতিতে হাজিরা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।


সরকারপ্রধানের নিজের ক্ষেত্রে দাপ্তরিক নিয়ম অনুসরণের এ উদ্যোগকে প্রশাসনে সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


পদবির আগে থাকবে না সম্মানসূচক শব্দ


এর আগে বুধবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক পরিপত্রে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর সঙ্গে সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগ, নথিপত্র ও সারসংক্ষেপ উপস্থাপনের ক্ষেত্রে তাদের পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ কিংবা অন্য কোনো সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়।


পরিপত্র অনুযায়ী, সরকারি চিঠিপত্র, নথি ও দাপ্তরিক যোগাযোগে রাষ্ট্রপতির নামের আগে ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রীর নামের আগে ‘মাননীয়’ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পদেও অপ্রয়োজনীয় সম্মানসূচক বিশেষণ ব্যবহারের পরিবর্তে সরাসরি সাংবিধানিক ও সরকারি পদবি ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।


সরকারের এ সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার থেকেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।


জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বাসসকে বলেন, রাষ্ট্রপতির আগে ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রীর আগে ‘মাননীয়’ শব্দ পরিহারের যে পরিপত্র জারি করা হয়েছে, সেটি যুগোপযোগী ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। এটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।


তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশ ও দেশের মানুষকে যে ভালোবাসেন, এই পরিপত্র তারই বহিঃপ্রকাশ।


মাঠ প্রশাসনেও পৌঁছে গেছে নির্দেশনা


শুধু সচিবালয় বা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নয়, সরকারের নতুন নির্দেশনা মাঠ প্রশাসনেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সব মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কাছে পরিপত্রটি পাঠানো হয়েছে।


জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেন বাসসকে বলেন, সরকারি চিঠিপত্রে রাষ্ট্রপতির নামের আগে ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রীর নামের আগে ‘মাননীয়’ ব্যবহার না করার বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্রটি ইতোমধ্যে সব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকেই এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।


তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সরকারি পত্রালাপ বা গুরুত্বপূর্ণ নথিতে পরিপত্রের ব্যত্যয় না ঘটে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।


মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এ নির্দেশনা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জানানো হয়েছে বলে জানান তিনি। ফলে কেন্দ্র থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত সরকারি দাপ্তরিক যোগাযোগে নতুন সম্বোধন-পদ্ধতি কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।


‘প্রধানমন্ত্রী’—পদই যথেষ্ট


সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা ব্যক্তির পরিচয়ের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক ও সরকারি পদবিই যথেষ্ট। অতিরিক্ত সম্মানসূচক বিশেষণের পরিবর্তে দায়িত্ব ও পদমর্যাদাকে প্রাধান্য দেওয়ার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি-কেন্দ্রিকতার বাইরে রাখার একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে।


প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেই এর বাস্তবায়ন শুরু হওয়ায় বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সরকারপ্রধান নিজেই যখন নতুন নিয়ম অনুসরণ করছেন, তখন প্রশাসনের অন্য স্তরের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম পালনের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই জোরালো হয়।


এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জেলা ম্যাজিস্ট্রেসি অধিশাখার যুগ্ম সচিব তানভীর আহমেদ বাসসকে বলেন, পরিপত্রটি ইতোমধ্যে মাঠ প্রশাসনের সব পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বৃহস্পতিবার কয়েকটি চিঠিপত্রেও এর বাস্তবায়ন দেখা গেছে।


তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতির আগে ‘মহামান্য’ এবং প্রধানমন্ত্রীর আগে ‘মাননীয়’ শব্দ পরিহারের নির্দেশনা বৃহস্পতিবার থেকেই পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। কোনো দপ্তরে এর ব্যত্যয় দেখা গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


ডিজিটাল হাজিরায় নিজের দৃষ্টান্ত


‘মাননীয়’ শব্দ পরিহারের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর নিজের দপ্তরে ডিজিটাল হাজিরা দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সময়মতো অফিসে উপস্থিতি এবং দাপ্তরিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল হাজিরা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেও একই ব্যবস্থার আওতায় হাজিরা দিয়ে সেই নিয়ম অনুসরণের দৃষ্টান্ত তৈরি করছেন।


প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অফিসে প্রবেশের সময় ডিজিটাল হাজিরা দেওয়ার পাশাপাশি কাজ শেষে বের হওয়ার সময়ও নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে।


সরকারপ্রধানের এ ধরনের পদক্ষেপ প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি সরাসরি বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা—রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির পদ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, দাপ্তরিক নিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার ঊর্ধ্বে কেউ নন।


কমছে প্রটোকলের বাড়তি আনুষ্ঠানিকতা


প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।


সরকারি কার্যক্রম ও প্রচারণায় প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার না করা, প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকলে গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং তার চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের জন্য ট্রাফিক সিগন্যাল বন্ধ না রাখার মতো উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।


দেশের ভেতরে ও বাইরে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া পতাকাবাহী গাড়ি ব্যবহার না করার বিষয়টিও সরকারের এ ধরনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে উল্লেখ করছেন সংশ্লিষ্টরা।


এসব সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে তা হলো—রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির জন্য বিশেষ সম্বোধন বা বাড়তি সুবিধার চেয়ে নিয়ম, দায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোই অগ্রাধিকার পাবে।


প্রশাসনে কী প্রভাব পড়বে


প্রশাসনিক ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতার পরিবর্তে দায়িত্ব ও পদকে সামনে আনার এ সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে এর ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ওপর। তবে সরকারের কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত একই নির্দেশনা কার্যকর করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।


বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নিজেই যখন ‘মাননীয়’ সম্বোধন বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিজের দপ্তরে কার্যকর করছেন এবং ডিজিটাল হাজিরার মতো সাধারণ দাপ্তরিক নিয়ম অনুসরণ করছেন, তখন প্রশাসনে এর প্রতীকী গুরুত্বও রয়েছে।


রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা ব্যক্তির এ ধরনের দৃষ্টান্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সময়ানুবর্তিতা, নিয়ম মেনে চলা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি আরও জোরদার করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


সব মিলিয়ে ‘মাননীয়’ শব্দ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটি শুধু সরকারি নথির ভাষাগত পরিবর্তন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় পদকে ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার একটি প্রশাসনিক দর্শন। আর সেই সিদ্ধান্তের প্রথম বাস্তব প্রয়োগ যদি প্রধানমন্ত্রীর নিজের দপ্তর থেকেই হয়, তাহলে প্রশাসনের অন্যান্য স্তরেও তার প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।