
ছবি- সংগৃহীত
জাপানের কাছ থেকে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের জন্য প্রস্তাবিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য রপ্তানি বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ বাংলাদেশিদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ। এ উদ্দেশ্যে চার দিনের সরকারি সফরে জাপান যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৫ অক্টোবর সকালে ঢাকা ছাড়েন তারেক রহমান। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর এই সফরে দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও শ্রমবাজার সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং যৌথ সংবাদ ঘোষণা ও মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর ১৭ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্যাকেজটির পরিমাণ প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন, যা প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের সমান। পরিবহন, উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, ওষুধশিল্প, পর্যটন ও জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোসহ ১২টি অগ্রাধিকার খাতে এ সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত ১৪ বিলিয়ন ডলারকে ইতোমধ্যে নিশ্চিত বিনিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকল্পভিত্তিক আলোচনা, অর্থায়ন চুক্তি ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ওপর এর অগ্রগতি নির্ভর করবে।
পরিবহন ও শিল্প অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা
পরিবহন ও নগর যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায় ৩ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ। এ খাতের সম্ভাব্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল সম্প্রসারণ, রেলপথ উন্নয়ন এবং বড় সেতু নির্মাণ।
এ ছাড়া মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়ন উদ্যোগ এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পাঞ্চল, বন্দর ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তুলতে প্রায় ৩ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
মাতারবাড়ী অঞ্চলকে আঞ্চলিক উৎপাদন ও পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্পাঞ্চল, সড়ক ও রেল যোগাযোগ এবং জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়তে পারে।
উৎপাদনশিল্প, ইলেকট্রনিকস, গাড়ি ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ শিল্পের জন্য আরও প্রায় ১ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চাওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে গাড়ি সংযোজন কারখানা ও অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপনে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে চায় সরকার। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, নির্ভুল যন্ত্রপ্রকৌশল ও ইলেকট্রনিকস খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনাও রয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও জাপানের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। সম্ভাব্য উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে উপকূলীয় সুরক্ষা, বাঁধ উন্নয়ন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু-সহনশীল নগর অবকাঠামো নির্মাণ।
জাপানের বেসরকারি খাতের ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
এদিকে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা ৬ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে জাপানের। ২২ অক্টোবর রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জাপানের সংবাদমাধ্যম নিক্কেই-এর বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য বিনিয়োগের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে গাড়ি ও অন্যান্য উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি অবকাঠামো এবং বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
তবে রয়টার্স জানিয়েছে, তারা এ প্রতিবেদনটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
বাস্তবায়িত হলে এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের বৃহত্তর অর্থনৈতিক সহযোগিতা পরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী উন্নয়ন প্রকল্পসহ বিভিন্ন বড় অবকাঠামো প্রকল্পে জাপান সহযোগিতা করে আসছে।
বছরে এক লাখ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর লক্ষ্য
জাপানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণও প্রধানমন্ত্রীর সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাপানের শ্রমিকসংকট মোকাবিলা এবং বাংলাদেশের তরুণদের বিদেশে কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ দক্ষ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর প্রস্তাব দিতে চায় বাংলাদেশ।
সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, নার্সিং, বয়স্কদের সেবা, গাড়ি চালনা এবং বিভিন্ন কারিগরি পেশা। জাপানের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রস্তুত করতে জাপানি ভাষা শিক্ষা, পেশাগত সনদ এবং বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ উদ্যোগের ভিত্তি হিসেবে দুই দেশের বিদ্যমান শ্রম সহযোগিতা কাজ করছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ও জাপান পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর দুই দেশ কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। ২০২৭ সালের ১ এপ্রিল থেকে এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে বছরে এক লাখ কর্মী ও শিক্ষার্থী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রশিক্ষণব্যবস্থা সম্প্রসারণ, স্বীকৃত পেশাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া গড়ে তোলা প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি কর্মীদের বৈধ পথে উপযুক্ত চাকরিতে নিয়োগ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
রপ্তানি বাড়াতে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির ওপর গুরুত্ব
জাপানের বাজারে তৈরি পোশাক, ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তিপণ্য ও অন্যান্য উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে চায় বাংলাদেশ।
এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সই হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সফরকালে চুক্তিটি কার্যকর করার প্রক্রিয়া এবং জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে।
চুক্তিটি দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদারের কাঠামো তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে এর সুফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া এবং জাপানের বাজারের মান ও চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার ওপর।
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে অবস্থিত বাংলাদেশ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতেও আগ্রহী সরকার। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জাপানি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বর্তমান প্রায় ৩৩৮টি থেকে বাড়িয়ে ৫০০টিতে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
একাধিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল রূপান্তর, বেসামরিক বিমান চলাচল এবং পরিবেশ সুরক্ষা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এর আগে জানিয়েছিলেন, সফরকে কেন্দ্র করে প্রায় আটটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছিল। এর মধ্যে তিন থেকে চারটি স্মারক সই হতে পারে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দেশটির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি) এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করতে পারেন।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনা, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দক্ষ কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ যখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণে কাজ করছে, তখন তারেক রহমানের এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে প্রস্তাবিত বিনিয়োগের বাস্তবায়ন, অর্থায়ন চুক্তি, নতুন শিল্পপ্রকল্প, রপ্তানি সুবিধা এবং বাংলাদেশিদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ কতটা তৈরি হয় তার ওপর।