
সরকারি কর্মজীবীদের জন্য নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে নতুন বেতন-ভাতা কাঠামো বাস্তবায়নের আগে সরকারি কর্মজীবী ও তাঁদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-ব্যয় ও সম্পদের হিসাব প্রতিবছর হালনাগাদ করে প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ আহ্বান জানান।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, আর্থিক সক্ষমতার কঠিন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তিন ধাপে সরকারি কর্মজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে তাঁদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রত্যাশা করা কঠিন।
তবে জনগণের করের টাকায় বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত সুফল পেতে হলে সব পর্যায়ের সরকারি কর্মজীবী ও তাঁদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাব প্রতিবছর হালনাগাদ ও প্রকাশের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেসব সরকারি কর্মজীবী প্রতিবছর তাঁদের আয়-ব্যয় ও সম্পদবিবরণী হালনাগাদ করে প্রকাশ করবেন, কেবল তাঁদের জন্যই নতুন বেতন-ভাতা বৃদ্ধি প্রযোজ্য হওয়া উচিত। যারা সম্পদবিবরণী প্রকাশ করবেন না, তাঁদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো প্রযোজ্য করা অনুচিত।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, এই শর্ত বাস্তবায়ন করা হলে সরকারি খাতে দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সরকারি কর্মজীবী অনিয়ম ও দুর্নীতির ঊর্ধ্বে থেকে পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন এবং সৎভাবে জীবনযাপন করেন। তাঁদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো ন্যায়সংগত ও অপরিহার্য। অন্যদিকে, যারা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ-সম্পদ অর্জনে লিপ্ত, তাঁদের জন্য এ সুবিধা যেমন অযৌক্তিক, তেমনি প্রয়োজনও নেই।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের ভাষ্য, কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে ঢালাওভাবে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হলে সরকারি খাতে দুর্নীতির মাত্রা আরও বাড়তে পারে।
নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—সরকারের এমন আশাবাদের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১৫ সালে বাস্তবায়িত অষ্টম বেতনকাঠামোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বাস্তবে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিপরীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বেড়েছে।
এবার এর ব্যতিক্রম হবে বলে আশা প্রকাশ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, সরকারি খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বৈশ্বিকভাবে পরীক্ষিত পদ্ধতি হিসেবে সম্পদবিবরণী প্রকাশের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে সরকারি খাতে দুর্নীতির দুষ্টচক্র থেকে জনগণের পরিত্রাণের উপায় নেই।
সবশেষে টিআইবি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, সরকারি কর্মজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ফলে নিত্যপণ্যের দাম ও মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। এতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ইতিমধ্যে চাপে থাকা স্বল্প আয়ের কর্মজীবী নারী-পুরুষসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি নতুন বেতন-ভাতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সম্পদবিবরণী প্রকাশের শর্ত কার্যকর করতে সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেছে টিআইবি।