
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়, এরপর বন্ধুত্ব, প্রেম। আর সেই প্রেমের টানে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন বিদেশি নাগরিকরা। কেউ এসে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন, কেউ আবার বিয়ে না করেই ফিরে গেছেন। চলতি ২০২৬ সালে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
১২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে অন্তত ১৪ জন বিদেশি নাগরিকের বাংলাদেশে প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৯ জন বাংলাদেশি নারী বা পুরুষকে বিয়ে করেছেন। বাকি পাঁচজনের ক্ষেত্রে বিয়ে হয়নি অথবা সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত বিয়ের তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে এটি কোনো সরকারি হিসাব নয়। বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে প্রবেশের সরকারি তথ্যের মধ্যে ‘প্রেমের টানে আসা’ নামে আলাদা কোনো শ্রেণি প্রকাশ্যে নেই। ফলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনাগুলো ধরে করা এই হিসাবকে ‘প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া ন্যূনতম সংখ্যা’ হিসেবে দেখা উচিত।
সবচেয়ে বেশি চীনা নাগরিক
প্রকাশিত ঘটনাগুলোর বড় অংশই চীনা নাগরিকদের নিয়ে। বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত কয়েকজন চীনা নাগরিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণী বা নারীর সঙ্গে পরিচয়ের পর প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বাংলাদেশে এসেছেন।
এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে টাঙ্গাইলে আসেন চীনের নাগরিক জংজিয়া মামুসার। উইচ্যাটে পরিচয়ের পর টাঙ্গাইলের মায়া আক্তারের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি মুসলিম রীতিতে তাঁদের বিয়ে হয়।
এটি ছিল চলতি বছরের অন্যতম প্রথম আলোচিত ঘটনা।
রংপুরে মা লিয়াংহুই
এপ্রিল মাসে রংপুরের মিঠাপুকুরে প্রেমের টানে আসেন চীনা নাগরিক মা লিয়াংহুই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে বাংলাদেশি তরুণী আনিকা আক্তারের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তিনি বাংলাদেশে এসে তাঁকে বিয়ে করেন। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ঘটনাটি ২৫ এপ্রিল সামনে আসে।
কুষ্টিয়ায় চেন বাও মিং
এর পরপরই কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় আসেন চীনা নাগরিক চেন বাও মিং। প্রায় এক বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের পর তাসলিমা খাতুনের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০ এপ্রিল বাংলাদেশে এসে তিনি কুষ্টিয়া আদালতে তাসলিমাকে বিয়ে করেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর বয়স ২৩ বা ২৪ বছর বলা হয়েছে।
মালয়েশিয়া থেকে কাপাসিয়ায় তরুণী
বিদেশি প্রেমিকদের তালিকায় শুধু পুরুষ নন, বিদেশি নারীও রয়েছেন। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আসেন নূরুল আতিয়া। সেখানে কর্মরত অবস্থায় বাংলাদেশি যুবক মোহন বন্দুকসীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেম হয়। পরে তিনি বাংলাদেশে এসে তাঁকে বিয়ে করেন। প্রথম আলোও এ ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
শরীয়তপুরে আমিরাতের নাগরিক
জুনে শরীয়তপুরের জাজিরায় প্রেমের টানে আসেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিক সলেমান। আবুধাবিতে বাংলাদেশি তরুণী সুবর্ণার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। পরে সুবর্ণা দেশে ফিরে এলে সলেমান বাংলাদেশে এসে তাঁকে বিয়ে করেন। ১৫ জুন তাঁদের বিয়ের খবর প্রকাশিত হয়।
কসবায় সোহান চাও
জুলাইয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় আসে আরেক চীনা নাগরিক সোহান চাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আয়েশা সুলতানার সঙ্গে পরিচয়ের পর তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। চীন থেকে বাংলাদেশে এসে সোহান চাও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং আয়েশাকে বিয়ে করেন।
নেত্রকোনায় ওয়াং সুলিন
জুলাইয়ের আরেক আলোচিত ঘটনা নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে। ফেসবুকে পরিচয়ের পর চীনা নাগরিক ওয়াং সুলিনের সঙ্গে নাজমিন আক্তার লিজার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুই পরিবারের সম্মতিতে ১৮ জুলাই ওয়াং সুলিন বাংলাদেশে আসেন। পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মো. নুর উদ্দিন নাম নেন এবং লিজাকে বিয়ে করেন।
কেরানীগঞ্জে ওয়াং জিয়াওপাং
জুলাইয়ের শেষ দিকে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে বিয়ে করেন আরেক চীনা নাগরিক ওয়াং জিয়াওপাং। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় ও সম্পর্কের পর তিনি বাংলাদেশে এসে সানজিদা আক্তারকে বিয়ে করেন। বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তাঁর নাম রাখা হয় শুভ ইসলাম।
পীরগঞ্জে ঝাওহুইয়ান
সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাটি রংপুরের পীরগঞ্জে। চীনা নাগরিক ঝাওহুইয়ান প্রায় এক বছর আগে ফেসবুকে আবিদা সুলতানার সঙ্গে পরিচিত হন। পরে সম্পর্ক প্রেমে গড়ালে তিনি ২৫ আগস্ট বাংলাদেশে আসেন। ১৬ দিন পর, ১০ সেপ্টেম্বর, তাঁদের বিয়ে হয়। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিয়ের আগে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আয়ান ইসলাম নাম নেন।
আরও একজন চীনা যুবক, বিয়ে এখনো হয়নি
সেপ্টেম্বরেই নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে চীনের নাগরিক হুয়াং ঝিলিন প্রেমের সম্পর্কের সূত্রে বাংলাদেশে আসেন। উইচ্যাটে পরিচয়ের পর সুমাইয়া বেগমের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে সংবাদ প্রকাশের সময় পর্যন্ত তাঁর বিয়ে হয়নি। প্রায় এক সপ্তাহ বাংলাদেশে অবস্থানের পরও বিয়ে না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে নানা আলোচনা তৈরি হয়।
যারা এসেছিলেন, কিন্তু বিয়ে হয়নি
সব বিদেশি প্রেমিক-প্রেমিকার গল্পের পরিণতি বিয়েতে হয়নি। জানুয়ারিতে মেহেরপুরে ফেসবুকে প্রেমের সূত্র ধরে দুই চীনা নাগরিক এক কিশোরীর বাড়িতে যান। স্থানীয় পরিস্থিতি ও পুলিশের উপস্থিতির পর তাঁদের বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হলেও তাঁরা রাজি হননি। পরে তাঁরা ফিরে যান।
জুনে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে চীনের নাগরিক এম এ হাইশান এক কিশোরীর সঙ্গে অনলাইন সম্পর্কের সূত্রে বাংলাদেশে আসেন। তবে মেয়েটির বয়স কম হওয়ায় বিয়ে করতে পারেননি এবং দেশে ফিরে যান। তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর অপেক্ষা করবেন বলেও জানিয়েছিলেন।
এ ছাড়া জুনে চীন থেকে আরেক যুবক রংপুরে এসে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি এবং শেষ পর্যন্ত ফিরে যান।
তাহলে হিসাব কত?
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলো আলাদা করে সাজালে চিত্রটি দাঁড়ায়—
ক্রম বিদেশি নাগরিক দেশ বাংলাদেশে আসার কারণ পরিণতি
১ জংজিয়া মামুসার চীন উইচ্যাটে প্রেম বিয়ে
২ মা লিয়াংহুই চীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেম বিয়ে
৩ চেন বাও মিং চীন অনলাইন প্রেম বিয়ে
৪ নূরুল আতিয়া মালয়েশিয়া প্রেম বিয়ে
৫ সলেমান সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রেম বিয়ে
৬ সোহান চাও চীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় বিয়ে
৭ ওয়াং সুলিন চীন ফেসবুকে প্রেম বিয়ে
৮ ওয়াং জিয়াওপাং চীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেম বিয়ে
৯ ঝাওহুইয়ান চীন ফেসবুকে প্রেম বিয়ে
১০ হুয়াং ঝিলিন চীন উইচ্যাটে প্রেম বিয়ে হয়নি/অপেক্ষমাণ
১১ এম এ হাইশান চীন অনলাইন প্রেম বিয়ে হয়নি
১২-১৩ দুই চীনা নাগরিক চীন ফেসবুকে প্রেমের সূত্র বিয়ে হয়নি
১৪ এক চীনা যুবক চীন প্রেমের সূত্র দেখা না পেয়ে ফিরে যান
অর্থাৎ সংবাদপত্রে প্রকাশিত শনাক্তযোগ্য ঘটনা অনুযায়ী অন্তত ১৪ জন বিদেশি নাগরিক প্রেম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্কের সূত্রে বাংলাদেশে এসেছেন; তাঁদের মধ্যে অন্তত ৯ জনের বিয়ে হয়েছে।
তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে
এই সংখ্যাকে কোনোভাবেই ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রেমের টানে আসা বিদেশিদের চূড়ান্ত সংখ্যা বলা যাবে না। কারণ এটি কেবল গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং অনলাইনে খুঁজে পাওয়া ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে তৈরি হিসাব। স্থানীয়ভাবে ঘটে যাওয়া অনেক আন্তদেশীয় বিয়ের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নাও হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব ঘটনায় চীনা নাগরিকদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ২০২৬ সালের প্রকাশিত ঘটনাগুলোর মধ্যে টাঙ্গাইল, রংপুর, কুষ্টিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নেত্রকোনা, কেরানীগঞ্জ ও পীরগঞ্জবিভিন্ন এলাকায় চীনা নাগরিকদের প্রেম ও বিয়ের খবর এসেছে। এর বাইরে মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাগরিকের বাংলাদেশে এসে বিয়ের ঘটনাও প্রকাশিত হয়েছে।