News update
  • ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৮৬৬     |     
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
সম্পাদকীয় 2026-09-13, 12:31pm

অস্ট্রেলিয়ার প্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন আফগান মুসলমানরা

whatsapp-image-2026-09-12-at-9-e4202f069049ebd96f91372bb821db071789281060.jpeg


মোহাম্মাদ আবদুল মতিন

সিডনি থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার উত্তরে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত মরুভূমি অঞ্চল। চারদিকে ধু-ধু লাল মাটি, তীব্র রোদ আর বিস্তীর্ণ শুষ্ক প্রান্তর। সেই কঠিন ভূখণ্ডের ছোট্ট জনপদ মারে-তেই উনিশ শতকে নির্মিত হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার প্রথম পরিচিত মসজিদ। মুসলিম উটচালকদের হাত ধরে গড়ে ওঠা এই মসজিদ শুধু একটি উপাসনালয় ছিল না, বরং অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল অনুসন্ধান, যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার ইতিহাসে মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানেরও এক অনন্য স্মারক।

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ১৮৬০-এর দশকেই মারে এলাকায় মুসলিম উটচালকদের একটি বসতি গড়ে উঠেছিল এবং সেখানেই অস্ট্রেলিয়ার প্রথম পরিচিত মসজিদ নির্মিত হয়। তবে মসজিদটির সুনির্দিষ্ট নির্মাণসাল নিয়ে ঐতিহাসিক সূত্রে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো সূত্রে ১৮৬০-এর দশক, আবার কোথাও ১৮৮০-এর দশকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ব্রডকাস্টিং করপোরেশন (এবিসি) মসজিদটিকে ১৮৬০-এর দশকের স্থাপনা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

১৮৬০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আনুমানিক ৩ হাজার মানুষ আফগানিস্তান, বেলুচিস্তান, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল থেকে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। তাঁদের অনেককে সম্মিলিতভাবে ‘আফগান’ বা ‘আফগান ক্যামেলিয়ার’ বলা হলেও তাঁরা সবাই আফগানিস্তান থেকে আসেননি। বর্তমান পাকিস্তান ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু এলাকা থেকেও মুসলিম উটচালক ও ব্যবসায়ীরা অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম ও শুষ্ক অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে তখন যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম ছিল উট। মরুভূমির কঠিন পরিবেশে উট পরিচালনায় দক্ষ এসব মুসলিম উটচালক অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অভ্যন্তরীণ অঞ্চলকে যোগাযোগের আওতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এই সময়কে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে ‘ক্যামেল এরা’ বা ‘উটের যুগ’ হিসেবেও বর্ণনা করা হয়। উটের কাফেলায় করে তাঁরা খাদ্য, পানি, পণ্য ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছে দিতেন দূরবর্তী খনি অঞ্চল, বসতি, রেললাইন নির্মাণ এলাকা ও টেলিগ্রাফ স্টেশনগুলোতে। তাঁদের শ্রম ও দক্ষতা অস্ট্রেলিয়ার দুর্গম অভ্যন্তরীণ অঞ্চল বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বর্তমানে মারে নামে পরিচিত এই জনপদের পুরোনো নাম ছিল হারগট স্প্রিংস। উনিশ শতকে এটি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। ওডনাডাটা ট্র্যাক, অ্যাডিলেড-ডারউইন ওভারল্যান্ড টেলিগ্রাফ লাইন এবং ভিক্টোরিয়ার স্বর্ণখনি অঞ্চলের দিকে যাতায়াতের পথের সঙ্গে এর গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ছিল।

প্রাকৃতিক পানির উৎসের কারণে এলাকাটি উটের কাফেলার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মুসলিম উটচালকরা সেখানে নিজেদের বসতি গড়ে তোলেন। তাঁদের বসতি পরবর্তী সময়ে ‘ঘান টাউন’ নামে পরিচিতি পায়।

ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, বসতির পরিচায়ক হিসেবে সেখানে খেজুরগাছও লাগানো হয়েছিল। সে সময় মারে শহরে বসতির ক্ষেত্রে জাতিগত বিভাজনও ছিল। মুসলিম ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল শহরের উত্তর দিকে, আর ইউরোপীয়দের বসতি ছিল দক্ষিণ দিকে।

মারে মসজিদ ছিল অত্যন্ত সাধারণ একটি স্থাপনা। বর্তমান সময়ের বিশাল গম্বুজ, মিনার কিংবা অলংকৃত স্থাপত্যের সঙ্গে এর কোনো তুলনাই চলে না। মাটির দেয়াল, কাঠ ও স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নির্মিত ছোট্ট এই মসজিদের ছিল সাধারণ গেবল ছাদ।

মসজিদের ভেতরে ছিল নামাজের স্থান, ছোট একটি মিম্বর এবং অজুর ব্যবস্থা। কাছাকাছি পানির উৎস ও আর্টেসিয়ান বোরের পানি ব্যবহার করে মুসল্লিরা অজু করতেন। ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় সেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন মুসল্লি নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন।

এই মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন একাধিক মুসলিম উটচালক, ব্যবসায়ী ও ধর্মীয় ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে বেজাহ দারভিশ (Bejah Dervish), দাদলেহ বালুচ (Dadleh Balooch), ফাইজ ও তাগ মহমেত (Faiz and Tagh Mahomet)-এর মতো ব্যক্তিদের নাম ইতিহাসে পাওয়া যায়। বিশ শতকের শুরুর দিকে আসিম খান (Assim Khan) মারে এলাকার একটি মসজিদে ইমামের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

মারে এলাকায় একাধিক মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। প্রাথমিক পর্যায়ের মাটির তৈরি মসজিদগুলোর অন্তত একটি প্রায় ১৯১০ সালের দিকে বিলীন হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে নির্মিত গ্যালভানাইজড লোহার মসজিদটিও ধীরে ধীরে ব্যবহারের বাইরে চলে যায় এবং একসময় জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে।

মুসলিম উটচালকদের প্রথম প্রজন্মের অনেকে মারা যাওয়ার পর এবং তাঁদের বংশধরদের একটি বড় অংশ ইসলামি অনুশীলন থেকে দূরে সরে যাওয়ায় মসজিদগুলোর নিয়মিত ব্যবহারও কমে যায়। শেষ পর্যন্ত পুরোনো মসজিদটি আর সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে মারে এলাকায় যে মসজিদটি দেখা যায়, সেটি মূল ভবনের একটি পুনর্নির্মিত প্রতিরূপ। ২০০৩ সালে ঐতিহাসিক স্থানটির স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এটি পুনর্নির্মাণ করা হয়। মূল মসজিদটি আর টিকে না থাকলেও এর ইতিহাস অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

লেখক: মোহাম্মাদ আবদুল মতিন, অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও লেখক।