News update
  • ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৮৬৬     |     
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
আতাউর রহমান, সম্পাদক, দৈনিক বঙ্গলোক সম্পাদকীয় 2026-09-15, 9:35am

পাঁচ দশকে বাংলাদেশের শাসনামলে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের চিত্র

a-i-7c827f263c0a03be52988f002b41794f1789443318.png


১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর সাড়ে পাঁচ দশকের পথ পেরিয়েছে বাংলাদেশ। এই দীর্ঘ সময়ে দেশটি যেমন পেরিয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সংঘাত ও ক্ষমতার পালাবদলের নানা অধ্যায়, তেমনি কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও তথ্যপ্রযুক্তিতে অর্জন করেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। বিভিন্ন সরকারের সময় উন্নয়নের অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে; কখনো অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গতি পেয়েছে, আবার কখনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প যেমন বদলে দিয়েছে দেশের যোগাযোগব্যবস্থার চিত্র, তেমনি তৈরি পোশাক, কৃষি ও প্রবাসী আয় শক্তিশালী করেছে অর্থনীতির ভিত্তি। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক সহনশীলতার প্রশ্নও সামনে এসেছে বারবার। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে দাঁড়িয়ে তাই বাংলাদেশের অর্জন ও সীমাবদ্ধতার দিকে ফিরে তাকানোর পাশাপাশি আগামী দিনের গণতান্ত্রিক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রের পথ নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।


স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা: দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস


বাংলাদেশের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা কোনো একক ঘটনা থেকে তৈরি হয়নি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ও ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তানের অংশ হওয়ার পর থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে।


১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালির অধিকারচেতনার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। মাতৃভাষা বাংলার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে তরুণদের আত্মত্যাগ বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে আরও শক্তিশালী করে।


এরপর ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বাধিকার আন্দোলন আরও ব্যাপক রূপ নেয়। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় রাজনৈতিক সংকটকে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যায়।


১৯৭১ সালের মার্চে রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, শিক্ষক, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশ নেন। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়।


এই বিজয় শুধু একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা নয়; এটি ছিল একটি জাতির রাজনৈতিক ও আত্মপরিচয়ের প্রতিষ্ঠা।


স্বাধীনতার পর শাসনামল: অর্জন ও সংকটের ধারাবাহিকতা


স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সরকার ও শাসনব্যবস্থা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। প্রতিটি সময়পর্বেরই কিছু অর্জন রয়েছে; একই সঙ্গে রয়েছে সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক সংঘাত ও বিতর্ক।


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার: ১৯৭২–১৯৭৫


স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ছিল সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসন পুনর্গঠন, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন ছিল এই সময়ের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর প্রত্যাবর্তনও দ্রুত সম্পন্ন হয়।


তবে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, অর্থনৈতিক সংকট, খাদ্যাভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সরকারের ওপর বড় চাপ তৈরি করে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে।


রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ১৯৭৫ সালে একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। একই বছরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।


জিয়াউর রহমানের সময়: ১৯৭৫–১৯৮১


জিয়াউর রহমানের সময় বহুদলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় চালু, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধির মতো বিষয় আলোচিত হয়। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্রেও তার উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


তবে এ সময় সামরিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও ঘটে। সামরিক বাহিনীতে একাধিক বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড তৎকালীন অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে।


হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময়: ১৯৮২–১৯৯০


১৯৮২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের পর এরশাদ সরকারের সময় উপজেলা ব্যবস্থা চালু, স্থানীয় প্রশাসনকে বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধ নীতিও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।


অন্যদিকে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ, দুর্নীতি এবং নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তার শাসনামলের বড় সমালোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।


সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা


১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।


তবে রাজনৈতিক সংঘাত ও সরকার-বিরোধী দলের বিরোধও তীব্র হতে থাকে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। আন্দোলনের মুখে ওই সরকারের মেয়াদ দীর্ঘ হয়নি।


শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদ ও ২০০১–২০০৬-এর রাজনৈতিক অধ্যায়


১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এ সময় ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা।


২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় আসে। ওই সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও রাজনৈতিক সংঘাত, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ে নানা সমালোচনা হয়। হাওয়া ভবনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র তৈরির অভিযোগও ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।


২০০৭ সালে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেয়। প্রায় দুই বছর পর ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে।


২০০৯–২০২৪: অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে ব্যাপক পরিবর্তন


২০০৯ সালের পর দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এ সময়ে বিদ্যুৎ, যোগাযোগ অবকাঠামো, ডিজিটাল সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে।


পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিভিন্ন মহাসড়ক, সেতু ও রেল প্রকল্প বাংলাদেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতার বিস্তারকে তুলে ধরে।


নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আনে। মেট্রোরেল ঢাকার গণপরিবহনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কর্ণফুলী টানেল চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।


তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তারের ফলে সরকারি বিভিন্ন সেবা অনলাইনে এসেছে। মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন ও ই-কমার্সের বিস্তার অর্থনীতির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে।


তবে এ সময় নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক, বিরোধী রাজনৈতিক দলের ওপর চাপ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও অর্থ পাচারের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় আসে।


২০২৪-এর রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার


২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।


এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ ও প্রশাসনে সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ এ সময় আলোচনার কেন্দ্রে আসে।


একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির মতো কঠিন চ্যালেঞ্জও সরকারের সামনে ছিল।


এই সময়ের বড় প্রত্যাশা ছিল একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার পথ তৈরি করা।


অর্থনীতিতে বদলে যাওয়া বাংলাদেশ


বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সাধারণ মানুষের শ্রম, মেধা ও উদ্যোক্তা মানসিকতা। কৃষির পাশাপাশি তৈরি পোশাক, প্রবাসী আয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং সেবা খাত অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে।


তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ করছেন; বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের অংশগ্রহণ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।


প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।


কৃষিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। উন্নত বীজ, সেচ, যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি প্রযুক্তি ও আধুনিক উৎপাদনপদ্ধতির ফলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে।


উন্নয়ন বনাম সুশাসন


অবকাঠামো উন্নয়ন একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু শুধু বড় প্রকল্প নির্মাণ করলেই মানুষের সব সমস্যা দূর হয় না।


নিত্যপণ্যের মূল্য, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার মান, আবাসন, নিরাপদ পরিবেশ ও ন্যায়বিচার—এসব বিষয় মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।


বাংলাদেশের সামনে তাই উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।


ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও বাজারে কারসাজির মতো অভিযোগের কার্যকর তদন্ত ও প্রতিকার প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।


উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয়, সময়, মান ও জনস্বার্থ নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি প্রকল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত জনকল্যাণ।


গণতন্ত্রের মূল শক্তি প্রতিষ্ঠান


গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের দিন ভোট দেওয়ার নাম নয়। এটি নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা।


একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসবে এবং জনগণের কাছে তার কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দেবে। বিরোধী দল সরকারের সমালোচনা করবে, গণমাধ্যম প্রশ্ন করবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক কাঠামো।


রাজনৈতিক মতপার্থক্য একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন সহিংসতা, প্রতিহিংসা বা নাগরিক অধিকার হরণের কারণ না হয়, সেটিই একটি পরিণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বড় পরীক্ষা।


তরুণদের বাংলাদেশ


বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগাতে মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।


কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক কৃষি, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও সবুজ প্রযুক্তির মতো নতুন খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা আগামী দিনের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।


ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শুধু সেতু-মহাসড়ক বা ভবনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে না; জ্ঞান, দক্ষতা, উদ্ভাবন ও মানবিক মূল্যবোধই হবে তার মূল ভিত্তি।


স্বাধীনতার স্বপ্ন থেকে গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ


বাংলাদেশের সাড়ে পাঁচ দশকের ইতিহাস একই সঙ্গে সংগ্রাম, অর্জন, ভুল ও ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে। পরবর্তী প্রজন্মের শ্রম ও মেধা সেই রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও সমাজকে এগিয়ে নিয়েছে।


পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল কিংবা কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের অবকাঠামোগত সক্ষমতার প্রতীক। তৈরি পোশাক শিল্প, কৃষি ও রেমিট্যান্স অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সেবাতেও এসেছে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।


কিন্তু একটি দেশের প্রকৃত শক্তি শুধু তার অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কতটা শক্তিশালী, তার ওপরও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে।


আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামনে তাই নতুন প্রত্যাশা হতে পারে—উন্নয়ন ও গণতন্ত্রকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।


এমন একটি বাংলাদেশ প্রয়োজন, যেখানে রাষ্ট্র হবে নাগরিকের সেবক, আইন সবার জন্য সমান, গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করবে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করা হবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছাবে সমাজের প্রতিটি স্তরে।


১৯৭১ সালে যে স্বাধীনতার জন্য মানুষ জীবন দিয়েছিল, সেই স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থকে আরও গভীর ও অর্থবহ করার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। মেধা, সাম্য, মানবিক মর্যাদা, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে গড়ে উঠুক সমৃদ্ধ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ এটাই হোক আগামী দিনের প্রত্যাশা।