News update
  • ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৮৬৬     |     
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, বিশেষ সংবাদদাতা : সম্পাদকীয় 2026-09-21, 3:45pm

দেশ পরিচালনায় কি সরকার দিশেহারা ?

1024px-7-1922ac9245bdfcab358a3102fc7ff22c1789983951.jpg


একটি সরকার যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়, তখন জনগণের প্রত্যাশা থাকে—অস্থিরতার পরিবর্তে স্থিতিশীলতা আসবে, অর্থনীতিতে গতি ফিরবে, বাজার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বিদ্যুৎ-গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতা যেন ক্রমেই ভিন্ন একটি চিত্র তুলে ধরছে। অর্থনীতি, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সরকারের সামনে একের পর এক সংকট। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—দেশ পরিচালনায় সরকার কি দিশেহারা হয়ে পড়েছে?

অর্থনীতির চাপে সাধারণ মানুষের জীবন যখন নাভিশ্বাস, তখন সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে তার সুফল কতটা পৌঁছেছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু একই সময়ে মাসিক মূল্যসূচক বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে মানেই পণ্যের দাম কমে গেছে—এমনটি নয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। গত কয়েক মাসে গ্যাসের সংকটে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। শিল্প পুলিশের সাম্প্রতিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ৪০০টির বেশি কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সংকট দীর্ঘ হলে বেশ কিছু কারখানা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সরকার বলছে, এসব সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া এবং এর পেছনে রয়েছে অতীতের ভুল নীতি, আমদানিনির্ভরতা ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতা। সরকারের উপদেষ্টারাও এ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। কিন্তু জনগণের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পরিকল্পনা কাগজে থাকবে, নাকি তার বাস্তব ফলও মানুষ দেখতে পাবে?

এর মধ্যেই ২১ সেপ্টেম্বর থেকে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলের দাম ১১৫ থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়ের চাপকে সরকার মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখিয়েছে।

কিন্তু জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পেট্রোল পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা মানুষের জন্য এটি নতুন বোঝা।

আরেকটি বড় উদ্বেগ আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারি কিংবা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে সরকারের দায়িত্ব হলো দল-মত নির্বিশেষে দ্রুত তদন্ত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। কোনো দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে সেই পরিচয় তার জন্য রক্ষাকবচ হতে পারে না। রাষ্ট্রের শক্তি তখনই কার্যকর বলে বিবেচিত হবে, যখন ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক—উভয়ের জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগ হবে।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, তারা inherited crisis মোকাবিলা করছে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, সরকার সংকট সমাধানে কাজ করছে এবং কিছু রাজনৈতিক পক্ষ ও ব্যক্তি সংকটকে কাজে লাগিয়ে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে বলে তিনি মনে করেন।

কিন্তু জনগণ এখন অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ শুনতে চায় না; তারা সমাধান দেখতে চায়। কে সংকট তৈরি করেছে—এই বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের হাতে। তাই অতীতের ব্যর্থতার ব্যাখ্যার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের হিসাবও জনগণ চাইবে।

দেশ পরিচালনা কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়; এটি জনগণের আমানত। সেই আমানতের প্রতি দায়িত্বশীল হতে হলে সরকারের প্রয়োজন দৃশ্যমান কর্মদক্ষতা, জবাবদিহি, বাজারে কঠোর নজরদারি, জ্বালানি নিরাপত্তার বাস্তব পরিকল্পনা এবং নাগরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।

মানুষ এমন একটি সরকার চায়, যে সরকার সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি সংকটের সমাধানও করতে পারে। জনগণ জানতে চায়—কবে বাজার স্বস্তি পাবে, কবে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট স্থায়ীভাবে কাটবে, কবে জ্বালানি নিয়ে অনিশ্চয়তা শেষ হবে এবং কবে সাধারণ মানুষ নিজ ঘর থেকে কর্মস্থল পর্যন্ত নিরাপদ বোধ করবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যত বিলম্বিত হবে, সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তত গভীর হতে পারে। তাই এখন সময় রাজনৈতিক বক্তব্যের চেয়ে কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার প্রমাণ দেওয়ার। কারণ জনগণের কাছে শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা নয়—ফলাফলই সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি।