
অভিনেতা আনোয়ার হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম সময়ের সীমা পেরিয়ে কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে। অভিনেতা আনোয়ার হোসেন তেমনই এক উজ্জ্বল নাম। শক্তিশালী কণ্ঠ, ব্যক্তিত্বময় উপস্থিতি, সংলাপ উচ্চারণের স্বতন্ত্র ভঙ্গি এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতার মর্যাদা দিয়েছে। বিশেষ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার চরিত্রে তার অনবদ্য অভিনয় তাকে এনে দেয় ‘মুকুটহীন নবাব’ উপাধি।
অভিনয়ের শুরু মঞ্চে
১৯৩১ সালের ৬ নভেম্বর জামালপুরে জন্মগ্রহণ করেন আনোয়ার হোসেন। ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। কর্মজীবনের পাশাপাশি তিনি নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন। মঞ্চে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রে তার অভিনয়কে আরও পরিণত করে।
পঞ্চাশের দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে তার পথচলা শুরু। তখনকার চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীদের জন্য প্রতিযোগিতা ছিল তীব্র। নায়ক-নায়িকার বাইরে শক্তিশালী চরিত্রাভিনয়ের সুযোগও ছিল সীমিত। কিন্তু নিজের প্রতিভা ও অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে আনোয়ার হোসেন খুব দ্রুত আলাদা অবস্থান তৈরি করেন।
চরিত্রের সংলাপ বলার পাশাপাশি তার অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা এবং কণ্ঠের ওঠানামা দর্শকের কাছে চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলত। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন নির্মাতাদের আস্থার একজন শিল্পী।
‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’তেই বদলে গেল পরিচয়
আনোয়ার হোসেনের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯৬৭ সালে। ওই বছর মুক্তি পায় ঐতিহাসিক চলচ্চিত্র ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’। এতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি।
ঐতিহাসিক চরিত্রটি পর্দায় ফুটিয়ে তোলা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। নবাব সিরাজউদ্দৌলার ব্যক্তিত্ব, আবেগ, দেশপ্রেম, রাজনৈতিক সংকট ও ট্র্যাজেডি সবকিছু একই সঙ্গে তুলে ধরতে হয়েছিল। আনোয়ার হোসেন সেই কঠিন দায়িত্ব অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করেন।
তার কণ্ঠে নবাবের সংলাপ, মুখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের আবেগ দর্শকদের গভীরভাবে নাড়া দেয়। চলচ্চিত্রটি তার অভিনয়জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। এরপর থেকেই তিনি দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘মুকুটহীন নবাব’ নামে।
এই উপাধি পরে তার নামের সঙ্গেই স্থায়ীভাবে জড়িয়ে যায়।
শুধু নবাব নন, ছিলেন বহুমাত্রিক অভিনেতা
আনোয়ার হোসেনকে শুধু ঐতিহাসিক চরিত্রের অভিনেতা হিসেবে দেখলে তার অভিনয়জীবনের ব্যাপ্তি পুরোপুরি বোঝা যায় না। তিনি নায়ক, খলনায়ক, জমিদার, রাজা, অভিভাবক, রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
একটি চরিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন আরেকটি চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার। কখনো কঠোর, কখনো আবেগপ্রবণ, কখনো কর্তৃত্বপূর্ণ আবার কখনো সাধারণ মানুষের ভূমিকায় তিনি নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন।
তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়া। ফলে পর্দায় তাকে শুধু অভিনেতা হিসেবে নয়, চরিত্র হিসেবেই মনে হতো।
‘জীবন থেকে নেয়া’য় অন্য এক আনোয়ার হোসেন
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’। রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে চলচ্চিত্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছবিটি আজও বিশেষভাবে আলোচিত। এই চলচ্চিত্রেও আনোয়ার হোসেনের অভিনয় দর্শকদের দৃষ্টি কেড়েছিল।
তার অভিনয় শুধু বিনোদননির্ভর ছিল না। সমাজ, ইতিহাস ও মানুষের জীবনসংগ্রামকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাঙালির রাজনৈতিক-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত বেশ কিছু চলচ্চিত্রে তার অভিনয় তাকে আরও আলাদা মর্যাদা দেয়।
কণ্ঠই ছিল অন্যতম পরিচয়
আনোয়ার হোসেনের অভিনয়ের কথা বলতে গেলে তার কণ্ঠের কথা আলাদাভাবে বলতে হয়। গভীর ও ভারী কণ্ঠস্বর ছিল তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সংলাপ উচ্চারণে তিনি শব্দের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।
একটি সংলাপ কখন ধীরে বলতে হবে, কোথায় কণ্ঠ উঁচু করতে হবে কিংবা কোথায় সামান্য বিরতি দিতে হবে এসব বিষয়ে তার ছিল অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। ফলে তার বলা অনেক সংলাপ চলচ্চিত্রের দৃশ্য ছাড়িয়ে দর্শকের স্মৃতির অংশ হয়ে যায়।
তার অভিনয়ের মধ্যে ছিল মঞ্চের শৃঙ্খলা এবং চলচ্চিত্রের ক্যামেরাবান্ধব অভিব্যক্তির সমন্বয়। এ কারণেই বড় পর্দায় তার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রভাবশালী।
শিল্পীর কাছে অভিনয় ছিল দায়বদ্ধতা
আনোয়ার হোসেনের অভিনয়জীবন শুধু জনপ্রিয়তা অর্জনের গল্প নয়; এটি ছিল একজন শিল্পীর দীর্ঘ সাধনার গল্প। সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের নির্মাণশৈলী বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, দর্শকের রুচিও বদলেছে। কিন্তু তিনি নিজের অভিনয়ের শক্তি দিয়ে দীর্ঘ সময় দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অনেকটাই প্রচারবিমুখ। পর্দায় যে রাজকীয় ব্যক্তিত্ব দেখা যেত, ব্যক্তিজীবনে তার সঙ্গে ছিল সরলতার পার্থক্য। অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠা এবং চরিত্রের প্রতি দায়বদ্ধতাই ছিল তার শিল্পীসত্তার মূল শক্তি।
পুরস্কারের চেয়েও বড় দর্শকের ভালোবাসা
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে আনোয়ার হোসেন পেয়েছেন নানা সম্মাননা ও স্বীকৃতি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি জাতীয় পর্যায়েও সম্মানিত হয়েছেন।
তবে তার সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল দর্শকের ভালোবাসা। একজন শিল্পী যখন মৃত্যুর পরও তার অভিনীত চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকেন, তখন সেটিই হয়ে ওঠে তার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
আনোয়ার হোসেনের ক্ষেত্রে ‘মুকুটহীন নবাব’ উপাধিটি সেই ভালোবাসারই প্রতীক।
কিংবদন্তির বিদায়
২০১৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন আনোয়ার হোসেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র হারায় এক শক্তিমান ও স্বতন্ত্র অভিনয়শিল্পীকে।
কিন্তু শিল্পীর মৃত্যু হলেও তার সৃষ্টি থেকে যায়। পর্দায় তার অভিনীত চরিত্রগুলো আজও নতুন প্রজন্মের দর্শককে আকৃষ্ট করে। বিশেষ করে ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চরিত্রে তার অভিনয় বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ইতিহাসে থেকে গেলেন ‘মুকুটহীন নবাব’
সময়ের সঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্রে বহু নতুন শিল্পী এসেছেন। বদলেছে অভিনয়ের ধরন, প্রযুক্তি ও নির্মাণশৈলী। কিন্তু আনোয়ার হোসেনের অভিনয়ের যে গভীরতা, কণ্ঠের যে দৃঢ়তা এবং চরিত্র ফুটিয়ে তোলার যে ক্ষমতা তা আজও আলাদা করে স্মরণ করা হয়।
তিনি শুধু একজন অভিনেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাসের চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলা, সামাজিক বাস্তবতাকে পর্দায় তুলে ধরা এবং অভিনয়ের নিজস্ব একটি ভাষা তৈরি করার ক্ষেত্রে তার অবদান অনস্বীকার্য।
বাংলা চলচ্চিত্রে তাই আনোয়ার হোসেনের নাম উচ্চারিত হলে তার সঙ্গে অবধারিতভাবেই ফিরে আসে সেই পরিচয় ‘মুকুটহীন নবাব’।
এটি কোনো রাজমুকুটের গল্প নয়; এটি অভিনয় দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া এক শিল্পীর গল্প। আর সেই কারণেই বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে আনোয়ার হোসেনের আসন আজও অমলিন।