News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক জলবায়ু ও পরিবেশ 2026-09-01, 11:39am

বিশ্বজুড়ে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের জন্য দায়ী কে?

whether-69ea5fba935bd90dc8bc44c7179e55221788241196.jpg


পৃথিবী মানুষের বসবাসের একমাত্র নিরাপদ আবাসস্থল। কিন্তু মানুষের উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পরিবেশের ওপর বাড়ছে চাপ। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, বায়ুদূষণ, নদী ও সমুদ্রদূষণ, বন উজাড়, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং প্লাস্টিক বর্জ্য সব মিলিয়ে পৃথিবীর পরিবেশ আজ এক গভীর সংকটের মুখে। প্রশ্ন উঠছে, বিশ্বজুড়ে পরিবেশের এই বিরূপ পরিস্থিতির জন্য আসলে দায়ী কে?


এক কথায় এর উত্তর মানুষের কর্মকাণ্ডই পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। তবে সব মানুষ, সব দেশ বা সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে দায়ী নয়। শিল্পোন্নত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার, বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কার্বন নিঃসরণ, বন উজাড় এবং বিশ্বব্যাপী অতিভোগের সংস্কৃতি বর্তমান পরিবেশ সংকটকে আরও তীব্র করেছে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও সংকট বাড়াচ্ছে।


শিল্পায়নের মূল্য দিচ্ছে পৃথিবী


আধুনিক সভ্যতার অগ্রগতির পেছনে শিল্পায়নের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ, কলকারখানা, যানবাহন, প্রযুক্তি ও নগরজীবন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু শিল্পায়নের বড় অংশ এখনও কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। এসব জ্বালানি পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হয়।


গ্রিনহাউস গ্যাসের অতিরিক্ত উপস্থিতি পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, আবহাওয়ার ধরন বদলে যাচ্ছে এবং কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিচ্ছে।


বন উজাড়ও বড় হুমকি


পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির ভূমিকা অপরিসীম। বন কার্বন শোষণ করে, অক্সিজেন সরবরাহ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। অথচ কৃষি সম্প্রসারণ, বসতি নির্মাণ, শিল্প, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক হারে বন উজাড় হচ্ছে।


একটি বন ধ্বংস মানে শুধু গাছ কাটা নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল। কমে যায় জীববৈচিত্র্য। বনভূমি কমে গেলে কার্বন শোষণের ক্ষমতাও হ্রাস পায়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়ে।


নদী-সমুদ্র দূষণে বিপন্ন জলজ প্রাণী


মানুষের বর্জ্যের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত নদী, খাল, হ্রদ ও সমুদ্রে গিয়ে পড়ে। শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, পয়োনিষ্কাশনের পানি, কৃষিজমির সার ও কীটনাশক এবং প্লাস্টিক বর্জ্য জলজ পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


বিশেষ করে প্লাস্টিক এখন বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটের অন্যতম প্রতীক। পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল থেকে শুরু করে নানা ধরনের একবার ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী নদী ও সমুদ্রে জমা হচ্ছে। এগুলো জলজ প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করছে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের কাছেও পৌঁছানোর আশঙ্কা তৈরি করছে।


বায়ুদূষণে শহরগুলো বিপর্যস্ত


বিশ্বের বড় শহরগুলোর অন্যতম সমস্যা বায়ুদূষণ। যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানা, নির্মাণকাজ, ইটভাটা এবং বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বাতাসে ক্ষতিকর কণা ও গ্যাসের পরিমাণ বাড়ছে।


উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক শহরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও যানজট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। রাস্তার পাশে নির্মাণসামগ্রী, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো এবং অপর্যাপ্ত সবুজ অঞ্চলও নগরের পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।


অতিভোগের সংস্কৃতিও দায়ী


পরিবেশ সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো অতিরিক্ত ভোগের প্রবণতা। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পণ্য উৎপাদন ও ব্যবহার করতে গিয়ে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করা হচ্ছে। নতুন পোশাক, ইলেকট্রনিক পণ্য, প্লাস্টিক সামগ্রী, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা নানা ধরনের ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে উৎপাদন, জ্বালানি ব্যবহার ও বর্জ্য।


একটি পণ্য তৈরির পেছনে পানি, বিদ্যুৎ, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ফলে একটি পণ্য ব্যবহারের আগে ও পরে পরিবেশের ওপর তার যে প্রভাব পড়ে, তা অনেক সময় ভোক্তার চোখের আড়ালে থেকে যায়।


শুধু সাধারণ মানুষ দায়ী নয়


পরিবেশ ধ্বংসের দায় কেবল সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যথার্থ নয়। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এবং নীতিনির্ধারকদেরও গুরুত্বপূর্ণ দায় রয়েছে। কোনো একটি কোম্পানি বা ব্যক্তি পরিবেশের ক্ষতি করলেও তার প্রভাব সীমিত থাকতে পারে; কিন্তু বৃহৎ শিল্পব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে পরিবেশের ওপর প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত হতে পারে।


এ কারণেই পরিবেশ রক্ষায় শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কার্যকর সরকারি নীতি, কঠোর পরিবেশ আইন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি।


দায় সবার সমান নয়


বিশ্বের সব দেশ সমান হারে পরিবেশ দূষণ করেনি। শিল্পবিপ্লবের পর দীর্ঘ সময় ধরে উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ কয়লা, তেল ও গ্যাস ব্যবহার করে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। ফলে ঐতিহাসিক কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে তাদের দায় গুরুত্বপূর্ণ।


অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বড় অংশ বহন করলেও তাদের ঐতিহাসিক অবদান তুলনামূলকভাবে কম। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, খরা ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগে এসব দেশের মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।


তাই পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে ‘সবার দায়িত্ব’ যেমন সত্য, তেমনি ‘সবার দায় সমান নয়’—এই বাস্তবতাও স্বীকার করতে হবে।


বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি


ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বন্যা ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির মতো সমস্যা দেশের পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকায় প্রভাব ফেলছে।


এর পাশাপাশি দেশের বড় শহরগুলোতে বায়ুদূষণ, জলাশয় দখল, প্লাস্টিক বর্জ্য, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও সবুজ অঞ্চল কমে যাওয়াও উদ্বেগজনক। তাই বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দিতে হবে।


সমাধানের পথ কী?


পরিবেশ রক্ষার প্রথম শর্ত হলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো। সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। শিল্পকারখানায় আধুনিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নদী ও জলাশয়ে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে।


বনভূমি রক্ষা ও নতুন করে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে হবে। গণপরিবহন উন্নত করে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানো যেতে পারে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব কৃষি, টেকসই নগর পরিকল্পনা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি।


পৃথিবীর পরিবেশ কোনো এক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দেশের সম্পত্তি নয়। এটি সবার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, অতিরিক্ত ভোগ, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার এবং প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণহীন হস্তক্ষেপ পরিবেশের ভারসাম্যকে বিপন্ন করেছে।


তাই প্রশ্নের উত্তর যদি হয় ‘বিশ্বজুড়ে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাবের জন্য দায়ী কে?’ তাহলে উত্তর হবে, দায়ী মূলত মানুষের কর্মকাণ্ড; তবে দায়ের মাত্রা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও দেশের ক্ষেত্রে এক নয়।


এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কে কতটা দায়ী এই বিতর্কের পাশাপাশি কে কতটা দায়িত্ব নেবে, সেটি নিশ্চিত করা। কারণ পরিবেশ রক্ষায় আজকের ব্যর্থতার মূল্য শুধু বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দিতে হবে। পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে উন্নয়ন ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।