News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক জলবায়ু ও পরিবেশ 2026-09-14, 8:52am

বিশ্বে উষ্ণতা বাড়ায় বদলে যাচ্ছে জলবায়ু, বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি

jolbayo-5266305a8b666d1eecc095978c8206001789354349.jpg


পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমেই বাড়ছে। এর প্রভাব এখন আর শুধু মেরু অঞ্চলের বরফ গলা বা দূরবর্তী কোনো পরিবেশগত সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, দাবানল ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো ঘটনা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যাহত করছে। জলবায়ুর এই পরিবর্তন খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও তৈরি করছে দীর্ঘমেয়াদি চাপ।


বিজ্ঞানীদের মতে, বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধিই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। কয়লা, তেল ও গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, শিল্পায়ন, বন উজাড় এবং অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বেড়েছে। এসব গ্যাস পৃথিবীর তাপ আটকে রাখায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।


তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন


জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর একটি হচ্ছে তাপপ্রবাহ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আগের তুলনায় বেশি দিন ধরে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা বিরাজ করছে। এতে মানুষের কর্মক্ষমতা কমছে এবং বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও বাইরে কাজ করা মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে।


অতিরিক্ত গরমে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক ও হৃদ্‌যন্ত্রের ওপর চাপ বাড়তে পারে। কৃষি ও নির্মাণ খাতের মতো খোলা পরিবেশে কাজ করা শ্রমিকদের ওপরও তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে। অনেক অঞ্চলে তীব্র গরমের কারণে কাজের সময় পরিবর্তন বা সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ রাখার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।


বদলে যাচ্ছে বৃষ্টির ধরন


জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাও দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হয়ে খরা দেখা দিচ্ছে, আবার কোথাও অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ফলে একদিকে পানির সংকট বাড়ছে, অন্যদিকে আকস্মিক বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।


অতিরিক্ত বৃষ্টিতে শহরের দুর্বল নিষ্কাশনব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। এতে সড়ক, বসতবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রামীণ এলাকায় ফসলের জমি পানিতে ডুবে কৃষকের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।


কৃষিতে বাড়ছে অনিশ্চয়তা


জলবায়ু পরিবর্তনের বড় প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। ফসল উৎপাদনের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা, পর্যাপ্ত পানি ও উপযুক্ত মৌসুম প্রয়োজন। কিন্তু তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী খরা কৃষি উৎপাদনকে অনিশ্চিত করে তুলছে।


অতিরিক্ত গরমে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যায়। পানির প্রয়োজন বাড়ে, ফলে সেচের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। আবার অতিবৃষ্টি বা বন্যায় পাকা ফসল নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাব সরাসরি খাদ্যের দাম ও সরবরাহব্যবস্থায় পড়তে পারে।


জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসল, আধুনিক সেচব্যবস্থা এবং আবহাওয়ার আগাম তথ্য কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।


গলছে বরফ, বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠ


বিশ্বের উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম বড় প্রভাব পড়ছে হিমবাহ ও মেরু অঞ্চলের বরফে। তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলে সমুদ্রে পানির পরিমাণ বাড়ে। একই সঙ্গে সমুদ্রের পানি উষ্ণ হয়ে প্রসারিত হওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাও বাড়তে পারে।


সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় ও নিচু অঞ্চলগুলোতে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ততার ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্বের বহু উপকূলীয় শহর ও দ্বীপাঞ্চলের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।


উপকূলের লবণাক্ত পানি কৃষিজমি ও মিঠাপানির উৎসে প্রবেশ করলে মানুষের পানীয় জল ও কৃষি উৎপাদন দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।


বাড়ছে ঘূর্ণিঝড় ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি


উষ্ণ সমুদ্র ও পরিবর্তিত বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি অনেক অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শক্তিশালী ঝড়, ভারী বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা মানুষের জীবন ও সম্পদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।


একটি বড় দুর্যোগের ক্ষতি শুধু তাৎক্ষণিক নয়। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎব্যবস্থা, ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়।


দাবানলের বিস্তার


বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে উষ্ণতা ও শুষ্কতা বাড়ার সঙ্গে দাবানলের ঝুঁকিও বাড়ছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে বন ও উদ্ভিদ শুকিয়ে যায়। তখন সামান্য আগুনও দ্রুত বড় এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।


দাবানলে শুধু বন ও বন্যপ্রাণী ধ্বংস হয় না, বিপুল পরিমাণ কার্বনও বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। এতে আবার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তন দাবানলের ঝুঁকি বাড়ায়, আবার বড় দাবানল জলবায়ু সংকটকে আরও তীব্র করতে পারে।


জীববৈচিত্র্যে বড় ধাক্কা


তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনে অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। কোনো কোনো প্রজাতি নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে পারলেও অনেক প্রজাতির জন্য তা সম্ভব হয় না।


সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও পানির রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যও ঝুঁকিতে পড়ছে। প্রবালপ্রাচীরের ওপর এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে মৎস্যসম্পদ ও উপকূলীয় মানুষের জীবিকাতেও প্রভাব পড়ে।


স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে


জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের সম্পর্কও গভীর। তীব্র তাপপ্রবাহের পাশাপাশি বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশ কিছু রোগবাহক মশার বিস্তারের জন্যও অনুকূল হতে পারে।


দুর্যোগের কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হলে স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। দীর্ঘস্থায়ী জলবায়ু উদ্বেগ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।


অর্থনীতিতে বাড়ছে চাপ


জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর বড় প্রভাব পড়ে অর্থনীতিতে। দুর্যোগে অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুনর্নির্মাণে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য সরবরাহ ও বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।


তাপমাত্রা বাড়লে বাইরে কাজ করা মানুষের কর্মক্ষমতা কমতে পারে। ফলে উৎপাদনশীলতা কমে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।


সমাধানের পথ নবায়নযোগ্য জ্বালানি


জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি কমাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। সৌর, বায়ু ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হয়।


এর পাশাপাশি বন সংরক্ষণ ও নতুন করে বৃক্ষরোপণ, শক্তির দক্ষ ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন এবং টেকসই নগর পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ।


অভিযোজনেও জোর দিতে হবে


জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো কঠিন। তাই ক্ষতি কমাতে অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ ও আশ্রয়কেন্দ্র, শহরে উন্নত পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, কৃষিতে জলবায়ু সহনশীল জাত, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ এসব উদ্যোগ মানুষের ঝুঁকি কমাতে পারে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, জলবায়ু সংকটকে শুধু পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, অভিবাসন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি বৈশ্বিক সংকট।


পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির গতি কমাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে। কারণ জলবায়ুর সংকট কোনো এক দেশের নয়—এর প্রভাব সীমান্ত মানে না। তাই নিরাপদ পৃথিবীর জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক উদ্যোগ, দায়িত্বশীল উন্নয়ন এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।