
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধ করতে হবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ কল্যাণকে। এ-সংক্রান্ত রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) এ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নির্ধারিত করের অর্থ তিন বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এ রায় ঘোষণা করেন। এ সময় এ-সংক্রান্ত আগে জারি করা রুল খারিজ করে দেন আদালত। ফলে আয়কর বাবদ গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ওই অর্থ আদায়ের আইনি বাধা দূর হলো।
হাইকোর্টে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। রায়ের পর ড. ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, এ রায়ের বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন।
রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট জামিউল হক ফয়সাল।
তিন বছরের মধ্যে কর পরিশোধ
আদালতের রায়ের ফলে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা আয়কর আদায়ের পথ তৈরি হয়েছে। আদালত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে এ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
করসংক্রান্ত বিরোধটি কয়েকটি করবর্ষকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে আদালতে বিচারাধীন ছিল। মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ করবর্ষ পর্যন্ত গ্রামীণ কল্যাণের কাছে এনবিআরের কর দাবি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। এ দাবির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে পৃথক দুটি রিট আবেদন করে।
রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করেন। পরবর্তী সময়ে মামলাটি নিয়ে একাধিক ধাপে আদালতে শুনানি হয়। শেষ পর্যন্ত নতুন বেঞ্চে পুনর্মূল্যায়নের পর বৃহস্পতিবার রুল খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
আগের রায় প্রত্যাহার
এ মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় এর আগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ৪ অক্টোবর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে এনবিআরের দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা পরিশোধের বিষয়ে দেওয়া আগের রায় স্বপ্রণোদিতভাবে প্রত্যাহার করে নেন হাইকোর্ট।
বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রায় প্রত্যাহার করেন। একই সঙ্গে মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে মামলাটি নতুন একটি হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠানো হয়।
নতুন বেঞ্চে মামলার নথি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পুনর্মূল্যায়নের পর বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত আগের রুল খারিজ করে এনবিআরের কর দাবির পক্ষে রায় দেন।
যে করবর্ষ নিয়ে বিরোধ
গ্রামীণ কল্যাণের বিরুদ্ধে এনবিআরের কর দাবি মূলত ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭—এই পাঁচ করবর্ষকে কেন্দ্র করে।
এসব করবর্ষের আয়কর নির্ধারণ ও পরিশোধের বিষয়কে কেন্দ্র করে গ্রামীণ কল্যাণ ও এনবিআরের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। এনবিআরের নির্ধারিত কর দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে গ্রামীণ কল্যাণ পৃথক দুটি রিট করে।
রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি রুল জারি করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর নতুন বেঞ্চে বিষয়টির পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। সেই প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে বৃহস্পতিবার আদালত রুল খারিজ করে দেন।
এর ফলে এনবিআরের নির্ধারিত আয়কর আদায়ের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির করা রিটের আর কোনো সুরাহা থাকল না হাইকোর্ট পর্যায়ে। এখন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পথই খোলা থাকছে।
আপিল করবে ইউনূসের পক্ষ
রায়ের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন।
অর্থাৎ হাইকোর্টের রায়ের পরও করসংক্রান্ত বিরোধটি উচ্চতর আদালতে গড়াতে পারে। আপিল করা হলে সেখানে হাইকোর্টের রায়, এনবিআরের কর নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট করবর্ষগুলোর হিসাব-নিকাশসহ মামলার আইনি বিষয়গুলো পর্যালোচনার সুযোগ থাকবে।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হাইকোর্টের রায়ের ফলে এনবিআরের দাবি করা অর্থ আদায়ের আইনি ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট হয়েছে।
দীর্ঘদিনের কর বিরোধে নতুন মোড়
গ্রামীণ কল্যাণের সঙ্গে এনবিআরের এই কর বিরোধ দীর্ঘদিনের। পাঁচটি করবর্ষের কর নির্ধারণকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে গড়ায়। একাধিকবার বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন, আগের রায় প্রত্যাহার এবং নতুন বেঞ্চে পুনর্বিবেচনার পর বৃহস্পতিবার মামলাটির বিষয়ে নতুন রায় এল।
৬৬৬ কোটি টাকার মতো বড় অঙ্কের কর দাবি হওয়ায় মামলাটি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। বিশেষ করে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে। তবে আদালতের রায়ে মূল প্রশ্ন ছিল সংশ্লিষ্ট করবর্ষে এনবিআরের নির্ধারিত কর দাবি আইনগতভাবে বহাল থাকবে কি না।
বৃহস্পতিবারের রায়ে হাইকোর্ট রুল খারিজ করে এনবিআরের দাবির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে গ্রামীণ কল্যাণকে ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতার মুখে পড়তে হলো।
তবে ড. ইউনূসের পক্ষ থেকে আপিলের ঘোষণা আসায় এ বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য এখন উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। হাইকোর্টের রায় বাস্তবায়ন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ এবং আপিলের পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে মামলাটি সামনে আরও গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যেতে পারে।