News update
  • ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৮৬৬     |     
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
আতাউর রহমান, সিডনি (অস্ট্রেলিয়া) থেকে: প্রথম পাতা 2026-09-21, 11:39am

অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকট

বাংলাদেশি পেশাজীবীদের সামনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

australia-bg20170124103525-f34aac2624d64208317434d8e33449ab1789969660.jpg

ছবি: সংগৃহীত


বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ উন্নত অর্থনীতির দেশ অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে দক্ষ জনশক্তির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল এবং কারিগরি খাতে এই ঘাটতি দূর করতে দেশটির সরকার অভিবাসন নীতিতে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী সংস্কার এনেছে। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র ও অভিবাসন মন্ত্রী টনি বার্ক (Tony Burke) দেশটির ক্যাপিটাল ক্যানবেরার ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে এক গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী বক্তব্য (National Press Club Address) প্রদান করেছেন। তাঁর এই বক্তব্যের পর অস্ট্রেলিয়ার বিশাল শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ ও পেশাদার জনশক্তির জন্য তৈরি হয়েছে এক অভূতপূর্ব সুযোগ। 

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মন্ত্রীর ঘোষণার পরপরই গত ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন এই অভিবাসন নির্দেশনা (Ministerial Direction 121 & 122) দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এই নতুন আইনটি কেবল নতুন আবেদনকারীদের জন্যই নয়, বরং পূর্বে আবেদন করে যারা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় (Undecided Applications) আছেন, তাদের ক্ষেত্রেও এটি সমভাবে প্রযোজ্য হবে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ায় বর্তমানে প্রায় ১ লক্ষ বাংলাদেশি স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। 

অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (ABS)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মূল ধারায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ৫৩.৫ শতাংশ এবং নারীর সংখ্যা ৪৬.৫ শতাংশ। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ২০,৫০০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী (International Students) অধ্যয়ন করছেন। এছাড়া প্রতি বছর উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে নতুন করে আরও প্রায় ১৪,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন।অভিবাসন মন্ত্রী টনি বার্ক তাঁর নীতিগত ভাষণে স্পষ্ট করেছেন যে, অস্ট্রেলিয়ার সরকার এমন একটি সুশৃঙ্খল, সুনির্দিষ্ট এবং লক্ষ্যভিত্তিক অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা দেশের আবাসন সংকট এবং জরুরি সেবা খাতের ঘাটতি দূর করতে সরাসরি অবদান রাখবে। 

মন্ত্রী ঘোষণা করেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হলো নিট ওভারসিজ মাইগ্রেশন (NOM) বা নেট অভিবাসন সংখ্যা এই অর্থ বছরে ২ লাখ ৪৫ হাজারে এবং ২০২৭-২৮ সালের মধ্যে ২ লাখ ২৫ হাজারে নামিয়ে আনা। তবে তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ঢালাও ছাঁটাই বা অতিরিক্ত কড়াকড়ি করলে তা দেশের অর্থনীতি, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং আবাসন খাতের চরম ক্ষতি করবে।" 

ফলে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ধরে রাখতে টেকসই ও দক্ষ জনশক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়া এই নতুন সংস্কারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দক্ষ কারিগরি কর্মীদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার। পূর্ববর্তী 'মিনিস্টেরিয়াল ডিরেকশন ১১৯' বাতিল করে জারি করা নতুন এই আইনের অধীনে স্বাস্থ্যসেবা (Healthcare), শিক্ষা (Education), আবাসন নির্মাণ (Construction), কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতের দক্ষ ভিসা আবেদনগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রসেসিং (Priority Processing) করা হচ্ছে। 

ফলে বাংলাদেশ থেকে যারা প্লাম্বার, ওয়েল্ডার, নার্স, আইটি প্রফেশনাল বা কেয়ার-গিভার হিসেবে আবেদন করবেন, তারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুততম সময়ে ভিসা পাবেন। 


এছাড়া অস্ট্রেলিয়া সরকার তাদের স্থায়ী রেসিডেন্সির 'পয়েন্ট টেস্ট' (Points Test) ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনছে, যেখানে আবাসন বা কনস্ট্রাকশন খাতের কারিগরি শিক্ষাগত যোগ্যতাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমমানের ডিগ্রির সমান পয়েন্ট দেওয়া হবে। টনি বার্ক তাঁর বক্তব্যে ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'ভিসা হপিং' বা এক ভিসা থেকে অন্য ভিসায় অবৈধভাবে রূপান্তর এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি থাকা (Overstayer) বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে যোগ্য ও প্রকৃত দক্ষ কর্মীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দ্বার সবসময় উন্মুক্ত। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় একমাত্র জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) অস্ট্রেলিয়ার এই নতুন নীতির সুফল কাজে লাগাতে দক্ষ কর্মী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সেখানে একজন দক্ষ কর্মীর মাসিক আয় প্রায় ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তবে এই বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। 


অস্ট্রেলিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে হলে প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো ইংরেজি ভাষায় আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা এবং কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা। কারিগরি পেশার জন্য আইইএলটিএস (IELTS) স্কোর ন্যূনতম ৫.৫ এবং পেশাদারদের জন্য ৭.০ থাকা আবশ্যক। 


বোয়েসেলের কর্মকর্তাদের মতে, চাহিদার তুলনায় আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক মানের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং প্রয়োজনীয় ইংরেজি জানা প্রার্থীর কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এই খামতি দূর করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ভাষা শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রথামাফিক শ্রমবাজারের বাইরে অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে পারলে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে এক বিশাল গুণগত পরিবর্তন আসবে। একই সাথে এটি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি নীতি সহায়তা এবং যুবসমাজকে অস্ট্রেলিয়ার নতুন পলিসি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতায় গড়ে তোলার মাধ্যমে এই শ্রমবাজার হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী বড় টার্নিং পয়েন্ট বা মোড়।