
গভীর সমুদ্রবন্দর, নতুন টার্মিনাল, ড্রেজিং ও ডিজিটালায়নের মাধ্যমে দেশের সমুদ্র ও নৌবন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়নের উদ্যোগ চলছে।
বাংলাদেশের সমুদ্র ও নৌবন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়নে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন গভীর সমুদ্রবন্দর ও কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, বন্দর সম্প্রসারণ, নিয়মিত ড্রেজিং, ইয়ার্ড সক্ষমতা বাড়ানো, ডিজিটাল সেবা চালু এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে দেশের বাণিজ্য অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট-সংক্রান্ত নথিতে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো, জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি, ড্রেজিং কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং বন্দর ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্র ও স্থলবন্দর উন্নয়ন, নদীবন্দর ও লঞ্চ টার্মিনালের আধুনিকায়ন, অভ্যন্তরীণ নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নৌযানের নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরনির্ভর। ফলে এ দুই বন্দরের সক্ষমতা ও কার্যক্রমের দক্ষতা দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের প্রধান সামুদ্রিক বাণিজ্যকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরে গত কয়েক বছরে পণ্য ও কনটেইনার পরিবহন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সংসদে দেওয়া তথ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫২ হাজার টন পণ্য এবং ৩৪ লাখ ৯ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে। ২০১০ সালে এর পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৯৬ হাজার টন এবং ১৩ লাখ ৪৩ হাজার টিইইউ।
২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ৪ দশমিক ০৭ শতাংশ, পণ্য হ্যান্ডলিং ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিং ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে বলে সংসদে জানানো হয়।
চট্টগ্রাম বন্দর ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন পরিচালিত হয়। সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়াতে ইতোমধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল চালু, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ, নিয়মিত মূলধনি ও রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং, নতুন কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং বন্দরসেবার ডিজিটালায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার জট কমাতে ইয়ার্ড ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংসদে দেওয়া নৌপরিবহনমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খালাস ও ডেলিভারি কার্যক্রমের প্রায় ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল করা হয়েছে। বাকি ২০ শতাংশও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার কাজ চলছে।
আমদানি করা কনটেইনার দ্রুত সরিয়ে নিতে বেসরকারি ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো ও অফডকের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বন্দরের ইয়ার্ড খালি করতে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা ১০ হাজারের বেশি টিইইউ কনটেইনার কাস্টমসের মাধ্যমে নিলামে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় বে-টার্মিনালকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই টার্মিনাল চালু হলে বড় মাদার ভেসেল সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে ট্রান্সশিপমেন্টের ওপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানি পণ্যের পরিবহন সময় ও ব্যয় কমতে পারে।
বর্তমানে নাব্যতা ও অন্যান্য নৌ-সীমাবদ্ধতার কারণে বড় আকারের অনেক জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না। বে-টার্মিনাল প্রকল্পে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারি নথিতেও চট্টগ্রাম বন্দরে বে-টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সম্প্রসারণে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগের এ প্রকল্পটি বাংলাদেশে বড় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের বিনিয়োগগুলোর একটি।
ডেনমার্কের সহযোগিতায় নির্মাণাধীন টার্মিনালটিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পটির নির্মাণকাজে তিন বছর এবং পরিচালনায় ৩০ বছরের মেয়াদ রাখা হয়েছে। পরে আরও ১৫ বছর মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
নতুন এই টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আধুনিক পরিচালনব্যবস্থা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
কক্সবাজারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের সামুদ্রিক অবকাঠামোতে নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে। নির্মাণাধীন বন্দরটি ২০২৯ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা জানিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পে প্রায় ১৬ মিটার গভীর নৌপথ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় ৮ হাজার ২০০ টিইইউ ধারণক্ষমতার কনটেইনারবাহী জাহাজ এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ডেডওয়েট টনের কার্গো জাহাজ ভেড়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংসদে জানানো হয়েছে।
বন্দরটি চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি বড় আকারের জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাবে। বর্তমানে বড় জাহাজের পণ্য পরিবহনে কলম্বো, সিঙ্গাপুর ও পোর্ট ক্লাংয়ের মতো বিদেশি ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের ওপর যে নির্ভরতা রয়েছে, তা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর ফলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ট্রান্সশিপমেন্ট-সংক্রান্ত ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে।
দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমুদ্রবন্দর মোংলাকেও আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের আওতায় আনা হয়েছে। বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড এবং অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোংলা বন্দরের বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ৮ লাখ টিইইউ পর্যন্ত উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ৪০ লাখ মেট্রিক টন পণ্য এবং ৩০ হাজার যানবাহন হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
ছয়টি অতিরিক্ত জেটির মধ্যে দুটির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এগুলো চালু হলে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
মোংলা বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বছরে ১৫ লাখ টন পণ্য ও ৪ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলের পায়রা বন্দরও সরকারের সামুদ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। রাবনাবাদ চ্যানেলের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ড্রেজিং এবং দুটি ট্রেইলিং সাকশন হপার ড্রেজার সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ সমুদ্রবন্দর হিসেবে বন্দরটির সক্ষমতা গড়ে তুলতে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। নদীবিধৌত এলাকায় পলি জমার কারণে চ্যানেলের নাব্যতা ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ায় নিয়মিত ড্রেজিংকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দেশের বন্দর উন্নয়নের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে আনতেও বড় পরিসরে ড্রেজিং কার্যক্রম চলছে। নদী, খাল ও নৌপথ খনন এবং পুনঃখননের মাধ্যমে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে নৌপথের নাব্যতা বৃদ্ধি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
সরকারি নথিতেও দেশের নদীপথের নাব্যতা পুনরুদ্ধারে ব্যাপক ড্রেজিং কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্দর আধুনিকায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ডিজিটাল ব্যবস্থা। চট্টগ্রাম বন্দরে পোর্ট কমিউনিটি সিস্টেম, ই-ডেলিভারি অর্ডার, ই-পেমেন্ট, ই-গেট পাস, সিপিএ স্কাই এবং পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডোর মতো প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এসব ব্যবস্থার লক্ষ্য হচ্ছে কাগজপত্রের ব্যবহার কমিয়ে বন্দরসেবাকে দ্রুত, স্বচ্ছ ও সমন্বিত করা। পাশাপাশি বন্দর পরিচালনার বিভিন্ন ধাপ স্বয়ংক্রিয় করা এবং আধুনিক কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সরঞ্জাম সংগ্রহের উদ্যোগও রয়েছে।
এর আগে চট্টগ্রাম বন্দরে অনলাইন ডেলিভারি অর্ডার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা চালুর তথ্য সরকারি নথিতেও উল্লেখ করা হয়েছে।
বন্দর আধুনিকায়নের পাশাপাশি নৌপরিবহন খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাহাজ নিবন্ধন ব্যবস্থা আধুনিক করা, বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল করা এবং নাবিকদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশি ও বিদেশি জাহাজে বাংলাদেশি নাবিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেও প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারি নথিতে নৌপরিবহন খাতে অনলাইন সেবা সম্প্রসারণ ও দক্ষ নাবিক তৈরির বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ নৌপথের নিরাপত্তার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে। নদীবন্দর ও লঞ্চ টার্মিনাল আধুনিকায়ন, নৌযান চলাচলে সহায়ক নেভিগেশন ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে গভীর সমুদ্রবন্দর, নতুন কনটেইনার টার্মিনাল, বিদ্যমান বন্দর সম্প্রসারণ, ড্রেজিং ও ডিজিটালায়নের সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাংলাদেশের সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন অবকাঠামোকে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বন্দরগুলোর পণ্য ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের নৌপথের ব্যবহার আরও বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।