
চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রকল্পের আওতায় রানওয়ে সম্প্রসারণ, যাত্রীদের জন্য পৃথক ট্রানজিট সেন্টার এবং আধুনিক কার্গো ভিলেজ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও চীনের সঙ্গে চট্টগ্রামের আকাশপথে যোগাযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
রানওয়ে ও যাত্রীসেবায় বড় পরিবর্তন
‘চট্টগ্রাম রিজিওনাল এয়ার হাব প্রজেক্ট’ নামে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) তৈরি করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সমন্বয়ে প্রকল্পটির পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রথম পর্যায়ে দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে বড় আকারের উড়োজাহাজ ওঠানামা এবং ট্রানজিট যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প প্রস্তাব অনুযায়ী, বিমানবন্দরের বর্তমান ২ হাজার ৯৪০ মিটার দীর্ঘ রানওয়ে পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার ৬০০ মিটারে উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি রানওয়ের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, সমান্তরাল ট্যাক্সিওয়ে এবং দ্রুত প্রস্থান ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বর্তমানে বিমানবন্দরটিতে উড়োজাহাজের পার্কিং স্ট্যান্ড রয়েছে ১১টি। পরিকল্পনায় আটটি ওয়াইড-বডি উড়োজাহাজের উপযোগী পার্কিং স্ট্যান্ড রাখার কথা বলা হয়েছে। বার্ষিক যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৮০ লাখ থেকে এক কোটি করার লক্ষ্য রয়েছে। বোর্ডিং ব্রিজের সংখ্যা দুটি থেকে বাড়িয়ে ছয়টি করা হবে। এর মধ্যে চারটি থাকবে বড় উড়োজাহাজের উপযোগী।
প্রায় ১০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে পৃথক ট্রানজিট সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে বোয়িং ৭৭৭ ও ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের পাশাপাশি এয়ারবাস এ৩৩০ ও এ৩৫০-এর মতো বড় উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ তৈরি হবে।
কার্গো পরিবহনে বাড়বে সক্ষমতা
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র হলেও দ্রুত পরিবহনের প্রয়োজন রয়েছে এমন পণ্যের ক্ষেত্রে আকাশপথের গুরুত্ব বাড়ছে। বিশেষ করে পচনশীল কৃষিপণ্য, তৈরি পোশাকের নমুনা, ইলেকট্রনিকস ও জরুরি ওষুধ পরিবহনে বিমানবন্দরের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।প্রস্তাবিত প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে বছরে ৭৫ হাজার থেকে এক লাখ টন পণ্য ব্যবস্থাপনার উপযোগী অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য নির্মাণ করা হবে আধুনিক কার্গো ভিলেজ। সেখানে পণ্য সংরক্ষণের জন্য কোল্ড-চেইন ব্যবস্থা ও বন্ডেড ওয়্যারহাউস স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।এতে চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য ও ওষুধ পাঠানোর সুযোগ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি ক্রেতাদের চট্টগ্রামে আসা সহজ হবে। চীন থেকে শিল্পের কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরাসরি আনার ক্ষেত্রেও সময় ও ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থায়নে এডিবির সহায়তা চাওয়া হয়েছে
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রথম পর্যায়ের জন্য প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছে প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ বা আর্থিক সহায়তা চেয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। বাকি ৭৫ মিলিয়ন ডলার সরকার ও বেবিচকের অর্থায়নে জোগানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বিমানবন্দরের আশপাশে হোটেল, শপিং মল, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও অন্যান্য সেবামূলক অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে আরও ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে প্রকল্পের প্রস্তাব
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক আকাশ যোগাযোগের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি।তিনি জানান, গত ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম চেম্বারের পক্ষ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর কাছে বিমানবন্দরটির উন্নয়নের বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়। এরপর সরকার ‘চট্টগ্রাম
রিজিওনাল এয়ার হাব’ প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেয়।
আমিরুল হক বলেন, প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও গতি সঞ্চার হবে। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নের সম্পর্ক বিস্তৃত হওয়ায় সরাসরি আকাশ যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে চীনা বিনিয়োগকারী ও কর্মীদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। সরাসরি ফ্লাইট চালু হলে তাদের যাতায়াত সহজ হবে।
২৪ ঘণ্টা চালুর পরামর্শ
চট্টগ্রাম এভিয়েশন ক্লাবের সভাপতি মো. আছিফ চৌধুরী বলেন, বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক হাবে রূপ দিতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়, সেবার মান ও পরিচালনব্যবস্থাও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে। কার্গো ভিলেজ, চেকিং কাউন্টার, বোর্ডিং ব্রিজ, লাগেজ বেল্ট ও উন্নত যাত্রী লাউঞ্জের পাশাপাশি বিমানবন্দরটি সপ্তাহের সাত দিন ২৪ ঘণ্টা চালু রাখার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তার মতে, আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করতে অবতরণ মাশুল প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে হবে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, হংকং ও তাইওয়ানসহ পূর্ব এশিয়ার গন্তব্যে চলাচলকারী বিমান সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর বিপণন, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উড়োজাহাজের জ্বালানির দাম নিশ্চিত করা জরুরি।
এসব পদক্ষেপ নেওয়া গেলে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরকে আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও কার্যকর হবে বলে মনে করেন তিনি।
টেকনিক্যাল স্টপওভার দিয়ে শুরু করার পরামর্শ
শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ নূর হোসেন বলেন, কোনো বিমানবন্দরকে হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে উড়োজাহাজের জ্বালানি গ্রহণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সেবার পাশাপাশি পর্যাপ্ত হোটেল সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব সুবিধা থাকলে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলোকে আকৃষ্ট করা সহজ হয়।
তিনি জানান, বর্তমান অবকাঠামোতেই অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনার কিছু সুযোগ রয়েছে। সপ্তাহে দুই থেকে তিনটি কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার সক্ষমতাও রয়েছে বিমানবন্দরটির। তবে এ সুযোগ কাজে লাগাতে বিমান সংস্থাগুলোর বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ও আগ্রহ প্রয়োজন।
তার মতে, যাত্রীদের চট্টগ্রাম হয়ে অন্য গন্তব্যে নেওয়ার মতো ট্রানজিট কার্যক্রম চালু করতে হলে বিমান সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত চাহিদা থাকতে হবে। তাই শুরুতে কারিগরি যাত্রাবিরতি বা ‘টেকনিক্যাল স্টপওভার’ সেবা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া বাস্তবসম্মত হতে পারে।
যাত্রী পরিবহন বাড়লেও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ৯ লাখ ৭৭ হাজার আন্তর্জাতিক যাত্রী যাতায়াত করেন। ২০২৫ সালেও এই সংখ্যা প্রায় ১০ লাখের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কার্গো পরিবহনেও রয়েছে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা।
একসময় চট্টগ্রাম থেকে চীন, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে সরাসরি ফ্লাইট চললেও পরে অবকাঠামোগত ও পরিচালনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেসব রুট বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এসব গন্তব্যে যেতে যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের ঢাকা কিংবা অন্য দেশের বিমানবন্দরে সংযোগ নিতে হয়।
প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সরাসরি আকাশ যোগাযোগ সম্প্রসারণ, কার্গো পরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থার কার্যক্রম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চট্টগ্রামকে কার্যকর আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করতে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়মিত ফ্লাইট, প্রতিযোগিতামূলক পরিচালন ব্যয় ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।