
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নির্ধারণে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তঃসরকার প্যানেল (আইপিসিসি)। এক সপ্তাহের আলোচনা শেষে সংস্থাটির সদস্য দেশগুলো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশ ২০২৮ সালে প্রতিবেদন প্রকাশের পক্ষে থাকলেও সৌদি আরব, ভারত ও চীনসহ কয়েকটি দেশ ২০২৯ সালে তা প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছে।
শুক্রবার ফ্রান্সের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধি বেনোয়া ফারাকো এ তথ্য জানান। তার মতে, প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নিয়ে মতবিরোধ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব ঘটাতে পারে।
লিংকডইনে দেওয়া এক পোস্টে ফারাকো বলেন, পাঁচ মহাদেশের উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বিস্তৃত জোট বিজ্ঞানীদের সুপারিশ করা সময়সীমা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তবে কয়েকটি দেশের বিরোধিতার কারণে আলোচনা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি।
তিনি বলেন, এ ধরনের অচলাবস্থা নতুন নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি মূল্যবান সময় নষ্টের ঝুঁকি তৈরি করছে।
জলবায়ুবিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষ আইপিসিসির সপ্তম মূল্যায়ন প্রতিবেদন বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানোর অগ্রগতি পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ২০২৮ সালে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পক্ষে থাকা দেশগুলোর যুক্তি, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দ্রুত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
অন্যদিকে সৌদি আরব, ভারত ও চীনসহ কয়েকটি দেশ ২০২৯ সালে প্রতিবেদন প্রকাশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, এতে উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতিবেদনের ফলাফল পর্যালোচনা এবং জাতীয় পরিকল্পনায় সেগুলো কাজে লাগানোর জন্য বেশি সময় পাবে।
সোমবার ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় আইপিসিসির বৈঠক শুরু হলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান জিম স্কিয়া সদস্য দেশগুলোকে অচলাবস্থা নিরসনের আহ্বান জানান। সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক ও সুনামগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে সতর্ক করেন তিনি।
এর আগে গত সপ্তাহে ৩০টিরও বেশি দেশের মন্ত্রীরা একটি যৌথ চিঠিতে স্বাক্ষর করেন। এতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর সঙ্গে যেসব দেশের স্বার্থের সংঘাত রয়েছে, তাদের ভূমিকার সমালোচনা করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, আইপিসিসির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ থেকে জাতিসংঘের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক প্রচেষ্টা দুর্বল হবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ৩৫টি দেশের প্রায় অর্ধেক ইউরোপীয় ও অন্যান্য শিল্পোন্নত দেশ। এ ছাড়া বিশ্বের ৪৪টি দরিদ্রতম দেশের প্রতিনিধিত্বকারী স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানও এতে স্বাক্ষর করেন। ছোট দ্বীপরাষ্ট্র ও উদীয়মান অর্থনীতির কয়েকটি দেশের মন্ত্রীরাও এই উদ্যোগে যুক্ত হন।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কায় থাকা মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের জলবায়ুবিষয়ক দূত টিনা স্টেগ প্রতিবেদন প্রকাশে বিলম্বের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য অত্যন্ত জরুরি।
স্টেগের অভিযোগ, আলোচনায় অন্তর্ভুক্তি, জাতীয় পরিকল্পনায় বিজ্ঞানের ব্যবহার এবং পরবর্তী বৈশ্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনায় বৈজ্ঞানিক প্রমাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অগ্রগতি আটকে রাখার ঘটনাকে তিনি সময়ক্ষেপণের চেষ্টা বলে উল্লেখ করেন।
জলবায়ু অ্যাকশন নেটওয়ার্কের শ্রীশান ভেঙ্কটেশও আলোচনার ব্যর্থতায় হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য দেশগুলোর হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল।
ভেঙ্কটেশ যত দ্রুত সম্ভব আইপিসিসির আলোচনা পুনরায় আয়োজনের আহ্বান জানান। তার মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিদিনই বাড়ছে। বিশেষ করে এই সংকট সৃষ্টিতে যেসব মানুষ ও জনগোষ্ঠীর দায় সবচেয়ে কম, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে।
আইপিসিসি সাধারণত প্রতি পাঁচ থেকে সাত বছর পর মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটির ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালে। পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশের সময় নিয়ে মতবিরোধ কাটিয়ে ওঠা না গেলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনার গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।