
ইয়েমেনের হুতিদের সাম্প্রতিক হামলায় ইরান জড়িত থাকার সৌদি আরবের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের দাবি, হুতিরা নিজেদের স্বার্থ ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সামরিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। তবে আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ানোর পক্ষে নয় দেশটি এবং সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে।
শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন। এর আগের দিন সৌদি আরবের এক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, দেশটির বিরুদ্ধে হুতিদের হামলা জোরদারে ইরান উৎসাহ জুগিয়েছে।
বাকাই বলেন, ইয়েমেনের হুতিদের সামরিক অভিযানে ইরানের ভূমিকা রয়েছে বলে যেসব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা তেহরান প্রত্যাখ্যান করছে। তার মতে, ইরান ও তার মিত্রদের সম্পর্ক সম্পর্কে যাদের ধারণা রয়েছে, তাদের কাছে এ ধরনের দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, উত্তেজনা বৃদ্ধি কোনো পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে না। শত্রুতা বন্ধে সহায়তার জন্য ইরান তার সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগাতে প্রস্তুত।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে হুতিদের হামলা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের দাবি, শুক্রবার তারা কয়েকটি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
জোটের এক মুখপাত্র জানান, দক্ষিণাঞ্চল ও রিয়াদ এলাকায় তিনটি ড্রোন এবং লোহিত সাগরের ওপর দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া ইয়ানবু শহরের ওপর একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়। লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবুতে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল পাইপলাইনের শেষ প্রান্ত অবস্থিত।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিষয়ক উপমন্ত্রী রায়েদ ক্রিমলি অভিযোগ করেন, সর্বশেষ সংঘাতের শুরুতে ওমানে বৈঠকের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল হুতিরা। তবে ইরানের মুখপাত্র দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে ইয়েমেনের অন্তর্বর্তী রাজধানী এডেনের বিমানবন্দর এলাকায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। শুক্রবার স্থানীয় নিরাপত্তা কার্যালয় এ তথ্য জানায়। এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে বিমানবন্দর এলাকায় এটি দ্বিতীয় হামলার ঘটনা। এতে কেউ হতাহত হয়নি বলে জানানো হয়েছে।
ইয়েমেনের তথ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, এডেন থেকে কায়রোগামী ইয়েমেনিয়া এয়ারওয়েজের একটি বিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় ক্ষেপণাস্ত্র দুটি আঘাত হানে। বিমানটি অল্পের জন্য রক্ষা পায়। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি বিমান থেকে প্রায় ৫০০ মিটার এবং রানওয়ের কেন্দ্র থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে আঘাত হানে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
মন্ত্রণালয় বলেছে, বেসামরিক বিমানবন্দরে এ ধরনের হামলা যাত্রী, বিমানের কর্মী এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। একই সঙ্গে এটি আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির লঙ্ঘন।
সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে হুতিরা জানিয়েছে, তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল সৌদি বাহিনীর কমান্ড সদর দপ্তর ও একটি অস্ত্রের গুদাম।
এর আগের দিন এডেনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাঁচজন নিহত এবং ১৬ জন আহত হন বলে জানিয়েছেন ইয়েমেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শায়া আল-জিন্দানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ওই হামলার নিন্দা জানিয়ে একে কাপুরুষোচিত কর্মকাণ্ড বলে উল্লেখ করেন।
ইয়েমেনের এক সরকারি মন্ত্রীর দাবি, প্রাসাদ চত্বরে থাকা ইয়েমেনি বাহিনী ও সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের কমান্ড সেন্টারগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল। অন্যদিকে হুতিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের দাবি, আল-মাশাইক প্রাসাদে সৌদি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সদর দপ্তরকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
গত সেপ্টেম্বরে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে আকস্মিক সামরিক অভিযান চালিয়ে হুতিরা সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি কৌশলগত এলাকা দখল করে নেয়। ওই অঞ্চলের কাছেই আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকীর্ণ জলপথ রয়েছে। এরপর থেকে হামলার মাত্রা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুতিদের দখল করা এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারে সৌদি আরবের বিমান সহায়তায় পাল্টা অভিযান চালাচ্ছে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী। তবে এখন পর্যন্ত তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়নি।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল রপ্তানিকারক সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। লোহিত সাগরে জাহাজ, তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।