News update
  • ইতিহাস গড়ে আবারও গোল্ডেন বুট জিতলেন মেসি     |     
  • ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ও সিলেটে ট্রেন চলাচল বন্ধ     |     
  • রাজধানী ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় এক রাতেই একাধিক নাশকতা     |     
  • নেতানিয়াহুকে হটিয়ে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেন গাদি আইজেনকট     |     
  • মিরপুরে বাসে অগ্নিকাণ্ডের চেষ্টা, চালক-সহকারীর তৎপরতায় এড়ালো বড় দুর্ঘটনা     |     
নিজস্ব প্রতিবেদক প্রথম পাতা 2026-10-26, 6:27pm

ঘরে ঘরে ডেঙ্গুর হানা: ঢাকার বুকে মরণব্যাধির এক ভয়াল রূপ

dengu-2-41dd3638c5131938433829b12de510b81793017651.jpg

ছবি: সংগৃহীত


রাজধানী ঢাকার প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন ডেঙ্গু জ্বরের বিষাক্ত ছোবল। এক নির্মম ও দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্কের মধ্যে কাটছে নগরবাসীর দিন-রাত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS)-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরে সারা দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৩৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ২৩ thousand ৯৪৮ জন ছাড়িয়েছে. সাম্প্রতিক সময়ে সংক্রমণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে; গত ২৪ ঘণ্টাতেই দেশে রেকর্ড ২,২৪৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন. বিগত মাসগুলোর তুলনায় সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর গ্রাফ তীব্র গতিতে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে ১৪৮ জন এবং চলতি অক্টোবর মাসে এ পর্যন্ত ১৩৯ জন ডেঙ্গু রোগী প্রাণ হারিয়েছেন. রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রায় প্রতিটি সরকারি-বেসরকারি hospital এখন ডেঙ্গু রোগীতে কানায় কানায় পূর্ণ। সিট না পেয়ে অনেক রোগীকে হাসপাতালের মেঝে কিংবা বারান্দায় চিকিৎসা নিতে দেখা যাচ্ছে। [1, 2]

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘস্থায়ী বর্ষার কারণে এডিস মশার প্রজনন ক্ষেত্র জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে. তবে এই প্রাকৃতিক কারণের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে নীতি-নির্ধারক ও স্থানীয় প্রশাসনের চরম অদূরদর্শিতা এবং মশা নিধনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব. দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ডেঙ্গু জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হলেও, প্রশাসনের পক্ষ থেকে মশক নিধনে কোনো কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়. ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লে নামমাত্র লার্ভিসাইড স্প্রে করা হলেও নিয়মিত ক্রাশ প্রোগ্রাম, সঠিক নজরদারি এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ বাস্তবায়নে প্রশাসনের এক ধরণের স্থবিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে. মশা নিয়ন্ত্রণে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ. অন্যদিকে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও ওষুধের সংকট পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। প্রশাসনের এই ধরণের ঢিলেঢালা দৃষ্টিভঙ্গি এবং সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে, যার ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে. [1, 2, 3, 4]

সাধারণত এডিস মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দেয়। এর সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে হঠাৎ করেই শরীর ১০১° থেকে ১০৪° ফারেনহাইট পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠা। এর সাথে দেখা দেয় অসহ্য মাথা ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা এবং হাড় ও মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা, যা সাধারণ মানুষের কাছে 'হাড়ভাঙা জ্বর' নামে পরিচিত। আক্রান্ত হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে সারা শরীরে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি এবং খাবারে তীব্র অরুচিসহ বমি বমি ভাব হতে পারে। তবে কিছু বিপজ্জনক লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে এক মুহূর্তও ঘরে রাখা যাবে না। অনবরত বমি হওয়া, তীব্র পেট ব্যথা, নাক, মাড়ি বা ত্বকের নিচে রক্তপাতের দাগ দেখা দেওয়া, চরম অবসাদ, শ্বাসকষ্ট বা রোগীর রক্তচাপ আচমকা কমে যাওয়া ডেঙ্গুর মারাত্মক রূপের লক্ষণ। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে রোগীকে অবিলম্বে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

যদি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়, তবে কিছু নিয়ম কঠোরভাবে পালন করতে হবে। ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে প্লাজমা লিকেজের কারণে শরীরে জলশূন্যতা তৈরি হয়। তাই রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি, খাওয়ার স্যালাইন বা ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, এবং ফলের রস খাওয়াতে হবে। জ্বর ও শরীর ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুধুমাত্র প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যাবে, যা দিনে সর্বোচ্চ ৪টির বেশি হওয়া উচিত নয়। কোনো অবস্থাতেই অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা কোনো ধরনের নন-স্টেরয়েডাল ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ানো যাবে না। এগুলো সেবনে শরীরের রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষমতা কমে যায় এবং মারাত্মক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি তৈরি হয়। রোগীকে কোনো প্রকার শারীরিক বা মানসিক পরিশ্রম করতে দেওয়া যাবে না এবং সম্পূর্ণ বিছানায় বিশ্রামে রাখতে হবে। একই সাথে আক্রান্ত রোগীকে দিন ও রাত সবসময় মশারির ভেতরে রাখতে হবে, যাতে সাধারণ মশা রোগীকে কামড়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে না পারে।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে "৩ দিনে ১ দিন, জমা পানি ফেলে দিন"— এই স্লোগানকে এখন প্রতিটি নাগরিকের অভ্যাসে পরিণত করতে হবে। এডিস মশা সাধারণত ঘরের ভেতরে বা আশেপাশে জমে থাকা পরিষ্কার ও স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। তাই ফুলের টব, ভাঙা প্লাস্টিকের পাত্র, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার বা এয়ার কন্ডিশনারের ট্রে-তে যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। এডিস মশা সাধারণত ভোরে এবং সন্ধ্যার আগে বেশি কামড়ায়। এই সময়ে শরীর ভালোভাবে ঢেকে রাখা পোশাক পরা উচিত। ঘরের দরজা ও জানালায় মশারী নেট ব্যবহার এবং ঘুমানোর সময় মশারির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা আবশ্যক। ঢাকার এই ডেঙ্গু মহামারী থেকে বাঁচতে কেবল সরকারি বা সিটি কর্পোরেশনের মশক নিধন অভিযানের ওপর ভরসা করে থাকলে চলবে না। নাগরিক সচেতনতা এবং প্রতিটি ঘরের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতাই পারে এই মরণব্যাধির বিস্তার রুখে দিতে। সচেতন হোন, সুস্থ থাকুন।