
শরীরের বিভিন্ন অংশে হঠাৎ গুটি বা ফোলা দেখা দিলে অনেকেই সেটিকে ক্যানসারের লক্ষণ মনে করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তবে সব গুটি ক্যানসার নয়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে তৈরি হওয়া তরল, পুঁজ, বায়ু বা অন্য কোনো পদার্থে ভরা থলিকে সাধারণভাবে সিস্ট বলা হয়। বেশির ভাগ সিস্ট ক্ষতিকর নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে কোনো চিকিৎসা ছাড়াই পর্যবেক্ষণে রাখা যায়। তবে কিছু সিস্ট বড় হয়ে ব্যথা, সংক্রমণ কিংবা সংশ্লিষ্ট অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, সিস্টের ধরন ও অবস্থান অনুযায়ী এর উপসর্গ ভিন্ন হতে পারে। ত্বকের নিচে সিস্ট হলে সাধারণত ছোট বা বড় গুটির মতো দেখা যায়। আবার ডিম্বাশয়ে সিস্ট হলে তলপেটে ব্যথা, মাসিকের অনিয়ম বা পেট ভারী লাগার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিডনি, স্তন কিংবা শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও বিভিন্ন ধরনের সিস্ট হতে পারে।
কেন হয় সিস্ট?
সিস্ট হওয়ার কারণ একেক ক্ষেত্রে একেক রকম। ত্বকের সিস্ট হতে পারে চুলের গোড়া বা ত্বকের কোনো অংশে কোষ জমে। হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে কিছু ধরনের সিস্টের সম্পর্ক রয়েছে। আবার সংক্রমণ, প্রদাহ, কোনো অঙ্গের নালিতে বাধা কিংবা জন্মগত কারণেও সিস্ট তৈরি হতে পারে।
তবে সিস্ট হলেই যে তা বিপজ্জনক এমন ধারণা ঠিক নয়। সিস্টের প্রকৃতি নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা অন্য পরীক্ষা লাগতে পারে।
চিকিৎসা কী?
সিস্টের চিকিৎসা নির্ভর করে এর ধরন, আকার, অবস্থান এবং রোগীর উপসর্গের ওপর। ছোট এবং কোনো উপসর্গ তৈরি করছে না এমন সিস্ট অনেক সময় শুধু পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পরীক্ষা করে এর পরিবর্তন দেখা হয়।
সিস্টে ব্যথা বা প্রদাহ হলে চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দিতে পারেন। কোনো সিস্টে সংক্রমণ হয়ে পুঁজ জমলে চিকিৎসার অংশ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা পুঁজ বের করার ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। আবার বড় আকারের সিস্ট, বারবার তৈরি হওয়া সিস্ট কিংবা আশপাশের অঙ্গে চাপ সৃষ্টি করা সিস্টের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।
কোনো সিস্ট অস্বাভাবিক মনে হলে চিকিৎসক আরও পরীক্ষা করে এর প্রকৃতি নির্ণয় করতে পারেন। বিশেষ করে দ্রুত বড় হওয়া, শক্ত হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা জরুরি।
নিজে থেকে সিস্ট ফাটানো বিপজ্জনক
ত্বকে সিস্ট বা গুটি দেখা দিলে অনেকে চেপে বা ফুটো করে সেটি বের করার চেষ্টা করেন। চিকিৎসকেরা এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। নিজে থেকে সিস্ট ফাটালে সেখানে সংক্রমণ, রক্তপাত ও প্রদাহ তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সিস্টের অংশ ভেতরে থেকে গিয়ে পরে আবারও তা তৈরি হতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
সব ধরনের সিস্ট প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে কিছু ধরনের সিস্ট ও সংশ্লিষ্ট জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
ত্বকের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, ত্বকে বারবার আঘাত বা অতিরিক্ত ঘর্ষণ এড়িয়ে চলা এবং ত্বকের সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত ওজন থাকলে স্বাস্থ্যকর খাবার ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাও উপকারী।
নারীদের ক্ষেত্রে মাসিকের অনিয়ম, তলপেটে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, পেট ভারী লাগা কিংবা অস্বাভাবিক রক্তপাত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন অনুযায়ী গাইনোকোলজিক্যাল পরীক্ষা করা যেতে পারে।
যেসব লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি
সিস্ট দ্রুত বড় হতে থাকলে, তীব্র ব্যথা হলে, জায়গাটি লাল বা গরম হয়ে গেলে, পুঁজ বা রক্ত বের হলে কিংবা জ্বর দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে হঠাৎ তীব্র পেটব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিস্ট নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার অবহেলাও করা ঠিক নয়। শরীরের কোথাও অস্বাভাবিক গুটি বা ফোলা দেখা দিলে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে এর কারণ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।