
ছবি- সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘর্ষ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বজুড়ে প্রধান প্রধান সমুদ্র বাণিজ্য পথগুলো চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর জেরে চলতি সপ্তাহে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। তেলের এমন অগ্নিমূল্যের কারণে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি আবার বেড়ে যাওয়ার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার ফের বাড়াতে বাধ্য হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
সপ্তাহের শুরুতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ‘ব্রেন্ট ক্রুড’ তেলের দাম এক দিনেই প্রায় ৬% বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পরবর্তীতে বিনিয়োগকারীরা লাভ তুলে নেওয়ায় (প্রফিট টেকিং) দাম কিছুটা কমলেও, তা ১০৭ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছিল। সামগ্রিকভাবে পুরো সপ্তাহে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১১%। সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানির বাজারে এটি অন্যতম বড় অস্থিরতার ঘটনা।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল এশীয় দেশগুলোর মধ্যে এখন তেলের এই ঊর্ধ্বগতিতে জ্বালানি খরচ, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং সার্বিক জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তেলের দাম দীর্ঘ মেয়াদে বেশি থাকলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ সহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার আবার বাড়াবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীরা নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু করেছেন।
সমুদ্রপথে চরম ঝুঁকি: বাবেল মান্দেব ও হরমুজ প্রণালী
আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কৌশলগত পয়েন্টকে কেন্দ্র করে এই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে:
● বাব এল-মান্দেব প্রণালী: ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল করে বাব এল-মান্দেব প্রণালীর কাছাকাছি দ্বীপগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা এই পথটি এশিয়া, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যের প্রধান রুট। এই পথে দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত তৈরি হলে জাহাজগুলোকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে (কেপ অফ গুড হোপ দিয়ে) যাতায়াত করতে হবে। এতে যাতায়াতের দূরত্ব কয়েক হাজার কিলোমিটার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি, বিমা ও পণ্য পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।
● হরমুজ প্রণালী: বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে আশঙ্কাজনক জায়গা হলো হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ প্রণালীটি দিয়ে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জ্বালানি রফতানি হয়। পারস্য উপসাগরে সামরিক পদক্ষেপ ও তেলের ট্যাংকারে হামলার খবরে তেল পরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার ভয় বেড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, বিকল্প পথগুলোর ক্ষমতা সীমিত থাকায় এই প্রণালীতে সাময়িক বাধা এলেও বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম মারাত্মকভাবে লাফিয়ে বাড়তে পারে।
জাহাজের ভাড়া ও পরিবহন খরচ রেকর্ডে
নিরাপত্তা সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে তেলের ট্যাংকার বাজারে। ব্লুমবার্গের তথ্যানুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনগামী সুপারট্যাংকারের দৈনিক ভাড়া বেড়ে প্রায় ৮ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা একটি নতুন রেকর্ড।
জাহাজ ভাড়া বাড়ার কারণে আমদানিকৃত তেলের চূড়ান্ত দামও বেড়ে যাচ্ছে। এতে তেল শোধনাগার, পরিবহন খাত এবং বিভিন্ন উৎপাদকমূলক শিল্পের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে। সংঘাত স্থায়ী হলে বিমানের টিকিট, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা ও খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর ক্ষতিকর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পিভিএম (PVM)-এর বিশ্লেষক জন ইভানস বলেন, "সংঘাত দীর্ঘায়িত হতে পারে ধরে নিয়েই বাজার প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ ও রফতানি হ্রাস পেলে জ্বালানির দাম উঁচুতে আটকে থাকবে।"
তবে মার্কিন জ্বালানি তথ্য সংস্থার (EIA) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুদ প্রত্যাশার চেয়ে কম কমেছে (১৬ লাখ ব্যারেল কমার আশঙ্কার বিপরীতে কমেছে মাত্র ৩ লাখ ৯১ হাজার ব্যারেল)। এতে সাময়িক জোগানের ভয় কিছুটা কমলেও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
এশিয়ার শেয়ারবাজারে বড় দরপতন
উচ্চ তেলের দাম, সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি এবং নতুন করে ঋণের সুদের হার বাড়ার আশঙ্কায় এশিয়াজুড়ে শেয়ারবাজারে পতন ঘটেছে:
● জাপান (Nikkei 225): দর কমেছে প্রায় ২%, সূচক ৬৩,৫০০ পয়েন্টের নিচে নেমে গেছে।
● দক্ষিণ কোরিয়া (Kospi): দর হারিয়েছে ১.৮%।
● হংকং (Hang Seng): কমেছে প্রায় ১%।
● ভারত (Sensex): লেনদেনের শুরুতেই সূচক প্রায় ৬০০ পয়েন্ট পড়ে যায়।
জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ চড়া দামে তেল আমদানির ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে, স্থানীয় মুদ্রার মান দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। পাশাপাশি সরকারি বন্ডের দর পতনের ফলে মার্কিন ১০ বছর মেয়াদী ট্রেজারি বন্ডের ইল্ড (সুদের হার) ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ৩০ বছর মেয়াদী ইল্ড বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৩৪ শতাংশে।
সুদের হার আবার বাড়ার ভয়
তেলের এই ধাক্কায় মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ফেডারেল রিজার্ভ)-এর পরবর্তী পদক্ষেপ সংক্রান্ত ধারণা বদলে গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগামী সভায় ফেডের সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা সেপ্টেম্বর ৩ তারিখের ৪১.৫% থেকে বেড়ে এখন ৬৪%-এ দাঁড়িয়েছে।
তেলের দামের কারণে উৎপাদন, বিতরণ ও পরিবহন খরচ বাড়লে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। ফলে অর্থনীতি শিথিল হওয়া বা শেয়ারবাজারে ধস নামা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি সামলাতে ব্যাংকগুলোকে সুদের হার দীর্ঘ সময়ের জন্য উঁচুতে ধরে রাখতে বা আরও বাড়াতে হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষেও এটি বড় দ্বিধাদ্বন্দ্ব—কারণ সুদের হার বাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতির কারণে সৃষ্ট সরবরাহ ঘাটতি বা রুট ব্লকেড সমাধান করা সম্ভব নয়।
চরম অস্থির তেলের বাজার
সপ্তাহের শেষভাগে এসে ব্যবসায়ীরা মুনাফা তুলে নিলে তেলের দাম এক দিনেই ৪%-এর বেশি কমে প্রতি ব্যারেল ৯৬ ডলারের কাছাকাছি নেমে আসে, যা বাজারের চরম অস্থিরতাকে নির্দেশ করে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই দাম কমা মানে এই নয় যে ঝুঁকি চলে গেছে; বরং টানা কয়েকদিনের লাফিয়ে বাড়ার পর এটি একটি সাময়িক সমন্বয় মাত্র।
সামনে তেলের বাজার কেমন যাবে তা নির্ভর করছে—জাহাজে হামলা বন্ধ হয় কি না, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে কি না এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংঘাত ছড়ানো রোধ করা সম্ভব হয় কি না তার ওপর।
যতক্ষণ না এই অঞ্চল দিয়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্য নিরাপদ হচ্ছে, ততক্ষণ বিশ্বের আর্থিক ও শেয়ারবাজার সামরিক উত্তেজনা ও তেলের সরবরাহ খবরের ওপর ভিত্তি করে মারাত্মক ওঠানামা করতে থাকবে।