
জাপানের ঐতিহ্যবাহী ফুল সাজানোর শিল্প ইকেবানা চর্চা করছেন একজন শিল্পী। ছবি: এপি
ফুল সাজানোর ঐতিহ্যবাহী জাপানি শিল্প ইকেবানার ইতিহাস ৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। শতাব্দী পেরিয়েও এই শিল্পের আবেদন কমেনি। বরং সৃজনশীলতা, মানসিক প্রশান্তি ও আত্মঅন্বেষণের সুযোগ খুঁজছেন এমন মানুষের কাছে ইকেবানা নতুন করে আকর্ষণ তৈরি করছে।
ইকেবানাকে অনেকটা ধাঁধা সমাধানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তবে সাধারণ ধাঁধার মতো এর কোনো একক সঠিক সমাধান নেই। প্রতিটি ফুল যেমন আলাদা, তেমনি প্রতিটি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন। তাই একই ফুল দিয়ে ভিন্ন মানুষ ভিন্নভাবে একটি সাজসজ্জা তৈরি করতে পারেন।
৪০ বছর বয়সী হিরোয়ুকি ওকাদা প্রায় সাত বছর আগে ইকেবানা শেখা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ইকেবানার তিনটি প্রধান ধারার অন্যতম এবং সবচেয়ে প্রাচীন স্কুল ইকেনোবোর শিক্ষক।
ওকাদার কাছে ইকেবানা কেবল ফুল সাজানোর কৌশল নয়, বরং নিজের ভেতরের জগতের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার একটি উপায়।
তিনি বলেন, ফুল সাজানোর মধ্যে এক ধরনের মানসিক পরিশুদ্ধি ও নিরাময়ের অনুভূতি রয়েছে। ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি এর মাধ্যমে মানুষ নিজের মনের অবস্থাও খুঁজে পেতে পারে।
ইকেবানা শেখানোর পাশাপাশি ওকাদা আগ্রহীদের ব্যাকফ্লিপও শেখান। সাধারণ সময়ে রুপালি চেইন ও জিনস পরলেও ফুল সাজানোর প্রদর্শনের সময় তিনি ঐতিহ্যবাহী আনুষ্ঠানিক কিমোনো পরেন।
আধুনিক জীবনের চাপ ও নানা সংকটের মধ্যে যারা আনন্দ, জীবনের উদ্দেশ্য কিংবা মানসিক স্বস্তি খুঁজছেন, ওকাদা তাদেরই একটি অংশের প্রতিনিধিত্ব করেন বলে মনে করেন।
তার ভাষায়, ফুল সাজানোর সময় মানুষ ফুলের জীবন, সৌন্দর্য ও অস্তিত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়। একই সঙ্গে নিজের মনের ভেতর কী আছে, সেটিও উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ ফুল সাজাতে সাজাতে মানুষ নিজের মুখোমুখি দাঁড়ায়।
ইকেবানার অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান কিয়োটোভিত্তিক ইকেনোবো স্কুলের শিকড় বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এই স্কুলের শাখা রয়েছে।
ওকাদা আগে একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়। ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের পার্থক্যের পাশাপাশি তাদের মধ্যে থাকা মিলও তাকে আকৃষ্ট করে।
পরবর্তী সময়ে ফুলের দোকানে কাজ শুরু করার পর তিনি এমন একটি কাজ খুঁজতে থাকেন, যার মাধ্যমে জাপানি সংস্কৃতির স্বতন্ত্র কোনো দিককে কাছ থেকে জানা যাবে এবং যা দীর্ঘদিন নিজের মতো করে চর্চা করা সম্ভব। সেই অনুসন্ধানেই ইকেবানার সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।
ইকেবানার সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। যদিও সাধারণত ছোট পরিসরে, একটি ছোট ফুলদানিকে কেন্দ্র করেই এর চর্চা করা হয়।
ইকেনোবো স্কুলের মনোনীত প্রধান সেনকো ইকেনোবো বলেন, ইকেবানা মূলত স্রষ্টা ও ফুলের মধ্যকার সম্পর্ককে প্রকাশ করে।
ইকেনোবো পরিবারের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পের সম্পর্ক রয়েছে। ইকেবানার শুরুর সময় থেকেই তাদের পরিবার এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। তার বাবা বর্তমানে ইকেনোবো স্কুলের প্রধান।
যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক জেনেট হ্যাভিল্যান্ড-জোনস বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ফুল এমনকি ফুলের সুগন্ধও মানুষের মধ্যে আনন্দের অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
তার মতে, উদ্ভিদজগতের ফুলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে দীর্ঘ বিবর্তনীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও দেখা যায়। মানুষের কাছে ফুল এক ধরনের সঙ্গীর মতো হয়ে উঠেছে।
তবে ওকাদার কাছে ফুলের গুরুত্ব শুধু তার সৌন্দর্য ও ঘ্রাণে সীমাবদ্ধ নয়। ফুলের পাপড়ি ও পাতার স্পর্শও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বিড়ালছানা বা কুকুরছানাকে আদর করার সময় যেমন স্পর্শের মাধ্যমে অনুভূতি তৈরি হয়, ফুলের ক্ষেত্রেও তেমন এক ধরনের অনুভব কাজ করে।
ইকেনোবো স্কুলে শিশু থেকে শুরু করে শতবর্ষী মানুষ পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী মানুষ ইকেবানা চর্চা করেন। ছোট শিশুরা মাকে দেখে ফুল সাজানোর চেষ্টা করে, আবার অনেক শিক্ষার্থী ১০০ বছর বয়সের পরও নিয়মিত এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।
সেনকো ইকেনোবো বলেন, কর্মজীবন ও মাতৃত্বের দায়িত্ব সামলানো নারী কিংবা বয়স্ক বাবা-মায়ের পরিচর্যায় ব্যস্ত মানুষদেরও ইকেবানা মানসিক স্বস্তি পেতে সহায়তা করতে পারে।
অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মায়ু শিমিজু প্রায় তিন বছর ধরে ওকাদার কাছে ইকেবানা শিখছেন। তার কাছে ইকেবানার অভিজ্ঞতা যোগব্যায়াম, ধ্যান কিংবা খেলাধুলার মতোই এক ধরনের নিরাময়ের অনুভূতি তৈরি করে।
শিমিজু বলেন, ফুলের সামনে বসে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করার সময় এক ধরনের শূন্যতার অনুভূতি তৈরি হয়। তখন মন আরও পরিষ্কার লাগে, প্রশান্তি আসে এবং মনের মধ্যে কোমল অনুভূতি তৈরি হয়।
ইকেনোবোর ঐতিহ্যবাহী ধারাগুলোর একটি হলো ‘শোকা শোফুতাই’। এ ধারায় ফুল, পাতা ও শাখাকে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে প্রকৃতিতে তাদের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার ধরন ফুটে ওঠে। যেমন সূর্যের আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া কিংবা বাতাসের ধাক্কায় শাখার বেঁকে যাওয়ার দৃশ্য।
ফুলদানি নিজেও এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি কাঠ বা মাটির তৈরি হতে পারে এবং পুরো বিন্যাসের ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচন করা হয়।
এই ধারার বৈশিষ্ট্য সরলতা ও সংযম। ফুলের প্রস্ফুটন থেকে ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে যে জীবনচক্র, সেটিও এখানে প্রতিফলিত হয়।
ইকেনোবোর এই বিন্যাসে তিনটি প্রধান উপাদান রয়েছে।
শিন: এটি সবচেয়ে উঁচু উপাদান। প্রথমে এটি সাজানো হয় এবং আকাশের দিকে প্রসারিত হওয়ার মাধ্যমে মানুষের মূল সত্তা বা কেন্দ্রকে বোঝায়।
সোয়ে: শিনের উচ্চতার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রাখা হয় এটি। সাধারণত এক পাশে অবস্থান করে এবং ফুলের স্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরে। এর পাতায় সামান্য বিবর্ণতা থাকলেও তা জীবনের পরবর্তী পর্যায়কে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করতে পারে।
তাই: এটি তৃতীয় উপাদান। এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎকে বোঝানো হয়। নতুন কোনো ফুল কিংবা সতেজ ছোট পাতা ব্যবহার করে জন্ম ও নতুন শুরুর প্রতীক তৈরি করা হতে পারে।
ইকেবানার ঐতিহ্যবাহী ধারার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত স্বাধীন কিছু শৈলীও গড়ে উঠেছে। এসব বিন্যাস দেখতে অনেকটা পাশ্চাত্যধারার সাধারণ ফুলের তোড়ার মতো। ফলে নতুনদের জন্যও এগুলো তুলনামূলক সহজ ও আনন্দদায়ক।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইকেবানা শুধু ফুল ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে গভীর করেনি, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শিল্পের চর্চার মাধ্যমে মানুষে মানুষে এবং এক প্রজন্মের সঙ্গে আরেক প্রজন্মেরও সংযোগ তৈরি করেছে।
প্রকৃতির ছোট্ট একটি অংশকে ফুলদানির মধ্যে সাজাতে গিয়ে ইকেবানা মানুষকে সৌন্দর্য দেখতে শেখায়, মনোযোগী হতে শেখায় এবং কখনো কখনো নিজের ভেতরের জগতের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেয়। এ কারণেই ৫০০ বছরের বেশি পুরোনো এই জাপানি শিল্প আধুনিক জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও নতুন প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।