
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ‘৩-আর’ কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। এর আওতায় রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন অর্থাৎ পুনরুদ্ধার, পুনঃস্থাপন ও পুনর্গঠনের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও সামাজিক কাঠামোকে এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তার প্রথম ভাষণ। তিনি বাংলায় ভাষণ দেন।
ভাষণের শুরুতে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদেরও স্মরণ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ সময়ের আন্দোলন ও সংগ্রামের পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে গুম, হত্যা, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো কর্মকাণ্ডের অবসানের পর দেশ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনে সরকার ৩-আর কৌশল গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, দেশের সামনে এখন সম্ভাবনার বিশাল দুয়ার খুলে গেছে। জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
শিল্পোৎপাদনের কেন্দ্র হতে চায় বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী জানান, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ বা উৎপাদনভিত্তিক শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল শুধু নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার অর্থনীতির ‘গণতন্ত্রায়ন’ করতে চায়।
এ জন্য বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্রীড়া কার্ড ও ই-হেলথ কার্ড।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারের নারীপ্রধানের নামে দেওয়া ফ্যামিলি কার্ড নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতে চালু করা সহায়তা কার্ডগুলোকে সমন্বিত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
নারীর শিক্ষা ও উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্ব
দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের পরিকল্পনায় নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
নারীর শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় নগদ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।
স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথাও ভাষণে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
সংঘাতের সমাধান সংলাপ ও কূটনীতিতে
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের কারণে অস্থিরতা, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান হওয়া উচিত আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। রাষ্ট্রগুলোর দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায়, পারস্পরিক স্বার্থের সুরক্ষা, সম্মান ও মর্যাদা।
জাতিসংঘকে শান্তিপূর্ণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্র হিসেবে দেখার কথা জানিয়ে তিনি সাধারণ ও পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
স্বাধীন ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন
ভাষণে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। ফিলিস্তিনি জনগণের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের উদ্বেগের কথা জানিয়ে তিনি তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আহ্বান
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নয় বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়ে আসছে বলে জানান তারেক রহমান। দীর্ঘদিনের এই সংকটে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়াকেই সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত তাদের জন্য জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য আরও কার্যকর ও দৃঢ় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চান তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বড় কর্মসূচি
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হলেও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে দেশের অবদান খুবই কম বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান।
আসন্ন কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার বিষয়ে আরও শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি।
জলবায়ু ও পরিবেশ রক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলেন তিনি।
বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বৈষম্য না বাড়ানোর আহ্বান
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভবিষ্যৎ পৃথিবীকে বদলে দেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীবপ্রযুক্তি ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সম্ভাবনার কথা বলেন।
তবে বর্তমানের ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিভাজনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করেন তিনি।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহারে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে জাতিসংঘের ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
নিরাপদ অভিবাসন ও এলডিসি উত্তরণ
নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বাণিজ্য সহজীকরণ, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: বাংলাদেশ ফর অল’
ভাষণের শেষ দিকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের একটি লক্ষ্য তুলে ধরেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে শক্তিশালী হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম বা জাতিগত পরিচয় নির্বিশেষে সব নাগরিক যেন সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে নিরাপদে বসবাস করতে পারেন, এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমুখী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
তরুণরা যেন ভয় ও বাধা ছাড়াই নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পারে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু যেন নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়, সেই বাংলাদেশের প্রত্যাশা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট: বাংলাদেশ ফর অল’।
জাতিসংঘের শান্তি ও মানবতার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংস্থাটির নীতি ও মূল্যবোধের প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ভাষণ শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের একই মঞ্চে এর আগে তার বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়াও বাংলাদেশ ও দেশের জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই প্রসঙ্গও নিজের বক্তব্যে স্মরণ করেন তারেক রহমান।