
যশোরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। জেলার সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ১০১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর বাইরে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও শতাধিক রোগী। চলতি মৌসুমে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৮৮ জন। এ রোগে মারা গেছেন তিনজন।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি। জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে অভয়নগর উপজেলায়। চলতি মৌসুমে সেখানে ৫৭৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় যশোরে নতুন করে ৩২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অভয়নগরে ১০ জন, কেশবপুরে আটজন, বাঘারপাড়ায় ছয়জন, মনিরামপুরে চারজন, শার্শায় তিনজন ও ঝিকরগাছায় একজন রয়েছেন।
হাসপাতালে বাড়ছে চাপ
ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ায় যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালেও রোগীর চাপ বেড়েছে। নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের শয্যা পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় রোগীদের পুরুষ ও নারী মেডিসিন ওয়ার্ডেও ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ২০ শয্যার বিশেষ ওয়ার্ড চালু রয়েছে। তবে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত সক্ষমতা অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছে। ডেঙ্গু ওয়ার্ড এবং পুরুষ ও নারী মেডিসিন ওয়ার্ড মিলিয়ে বর্তমানে ৫১ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
গত বুধবার হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৫৪৩ জন। চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জ্বর নিয়ে আসা রোগীর সংখ্যাই বেশি। প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি এসব রোগীকে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়েত বলেন, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় অতিরিক্ত চিকিৎসক ও নার্স নিয়োজিত রয়েছেন। ওষুধ ও স্যালাইনের সংকট নেই। তবে মানুষ সচেতন না হলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
নেই কীটতত্ত্ববিদ, হচ্ছে না বৈজ্ঞানিক জরিপ
ডেঙ্গুর সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়লেও যশোরের স্বাস্থ্য বিভাগে বর্তমানে কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। প্রায় দুই বছর ধরে পদটি শূন্য রয়েছে। ফলে জেলার কোথায় এডিস মশার প্রজননস্থল রয়েছে, কোন এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি এবং কীভাবে রোগটি ছড়িয়ে পড়ছে, সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে নিয়মিত জরিপ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কীটতত্ত্ববিদ না থাকা বড় ধরনের দুর্বলতা। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, কীটতত্ত্ববিদ নিয়োগের জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
যোগাযোগব্যবস্থা ও জলাবদ্ধতায় বাড়ছে ঝুঁকি
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমানের মতে, কয়েকটি কারণে যশোরে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্র হওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়মিত ট্রেন, বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক যশোরে আসে। এসব যানবাহনের মাধ্যমে এডিস মশার বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে ট্রাকের পেছনের অংশ, গ্যারেজ ও পরিত্যক্ত টায়ারে জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। পাশাপাশি ভারত ও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যশোরে মানুষের যাতায়াতও বেশি। উন্নত চিকিৎসাসেবার কারণে আশপাশের জেলার ডেঙ্গু রোগীরাও যশোরে চিকিৎসা নিতে আসেন।
অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান বলেন, অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুরের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে বৃষ্টিও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। পরিস্থিতি জটিল হলেও জেলায় এডিস মশার ঘনত্ব, লার্ভার বিস্তার কিংবা সংক্রমণের উৎস নিয়ে সাম্প্রতিক কোনো জরিপ হয়নি।
অবসরপ্রাপ্ত জেলা কীটতত্ত্ববিদ আমিনুল হক বলেন, গ্রামাঞ্চলে এডিস অ্যালবোপিকটাস এবং শহরাঞ্চলে এডিস ইজিপটাই বেশি পাওয়া যায়। ডেঙ্গু বিস্তারে দুটি প্রজাতিই ভূমিকা রাখে।
যশোরের সিভিল সার্জন ডা. মাসুদ রানা বলেন, শুরুতে ঢাকা থেকে আসা রোগীদের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্ত হলেও পরে স্থানীয়ভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে থাকছে, যা এডিস মশার প্রজনন বাড়াচ্ছে। অক্টোবর মাসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।
ক্যাপশন: যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় নির্ধারিত ওয়ার্ডের পাশাপাশি মেডিসিন ওয়ার্ডেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।