News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
খবর 2026-09-08, 10:13am

আজ কিংবদন্তি শিল্পী ভূপেন হাজারিকার জন্মদিন

মানুষের গান গেয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন মানুষেরই কণ্ঠস্বর

vopen-harazi-54d1063c0a4dd327cc672749b494a7661788840827.jpg


কখনো তিনি গেয়েছেন নদীর কথা, কখনো মানুষের কথা। কখনো তাঁর কণ্ঠে উঠে এসেছে বঞ্চিতের আর্তি, কখনো সীমান্ত পেরিয়ে মানবতার জয়গান। তাঁর গানের সুরে যেমন ছিল অসমের মাটি ও মানুষের ঘ্রাণ, তেমনি ছিল গোটা উপমহাদেশের মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম ও ভালোবাসার গল্প। তাই একটি নির্দিষ্ট ভাষা, অঞ্চল কিংবা দেশের গণ্ডিতে তাঁকে আটকে রাখা যায় না। তিনি ছিলেন মানুষের শিল্পী মানুষের দুঃখ, আনন্দ, প্রেম, প্রতিবাদ ও স্বপ্নের শিল্পী।


আজ ৮ সেপ্টেম্বর কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ভূপেন হাজারিকার জন্মদিন। ১৯২৬ সালের এই দিনে ভারতের আসাম রাজ্যের সদিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলা ও অসমিয়া সংগীতকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। ২০১১ সালের ৫ নভেম্বর তাঁর জীবনাবসান হলেও তাঁর কণ্ঠের আবেদন আজও অমলিন।


ভূপেন হাজারিকার গান শুধু শোনার বিষয় নয়; তাঁর গান অনুভব করার বিষয়। তাঁর কণ্ঠে নদী হয়ে ওঠে মানুষের প্রতীক, নৌকা হয়ে ওঠে জীবনের প্রতীক, আর মানুষের মুখ হয়ে ওঠে সমগ্র পৃথিবীর মুখ। তাঁর সৃষ্টির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তিনি জটিল জীবনদর্শনকে সাধারণ মানুষের ভাষায়, সহজ সুরে ও গভীর আবেগে প্রকাশ করতে পারতেন।


জন্ম থেকেই সংগীতের আবহ


ভূপেন হাজারিকার জন্ম হয়েছিল এমন এক পরিবারে, যেখানে সংগীতের প্রতি ছিল গভীর অনুরাগ। ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। মাত্র অল্প বয়সেই গান লেখা ও গাওয়ার পাশাপাশি সংগীত নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তার বিকাশ শুরু হয়।


শৈশবেই তিনি গান রচনা করেন এবং পরবর্তী সময়ে অসমিয়া চলচ্চিত্রের সঙ্গেও যুক্ত হন। তাঁর কণ্ঠে ছিল একদিকে গভীর দরদ, অন্যদিকে অসাধারণ শক্তি। সেই কণ্ঠ যখন কোনো গানকে ধারণ করত, তখন তা কেবল সুর হয়ে থাকত না গানের কথার সঙ্গে মিশে তৈরি করত এক অনন্য আবেগ।


তাঁর শিক্ষাজীবনও ছিল অসাধারণ। তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি গণযোগাযোগ ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হন। বিদেশের মাটিতে থেকেও তাঁর মন পড়ে ছিল নিজের দেশ, নিজের মানুষ ও নিজের সংস্কৃতির কাছে।


এই সময় তাঁর চিন্তার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবন, সংগ্রাম ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তাঁকে মানবতাবাদী শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে।


‘মানুষ মানুষের জন্য’—এক অনন্ত মানবতার গান


ভূপেন হাজারিকার নাম উচ্চারণ করলেই যে গানটি অসংখ্য মানুষের মনে ভেসে ওঠে, সেটি হলো ‘মানুষ মানুষের জন্য’।


এই গান কেবল একটি গান নয়; এটি যেন মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বের এক চিরন্তন আহ্বান। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা কিংবা ভূগোলের বিভাজন পেরিয়ে মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।


পৃথিবী যত আধুনিক হয়েছে, মানুষের জীবন যত প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে, ততই কোথাও কোথাও মানুষে মানুষে দূরত্বও বেড়েছে। যুদ্ধ, সংঘাত, বৈষম্য, সহিংসতা ও অবিশ্বাসের এই সময়ে ভূপেন হাজারিকার সেই মানবতার গান যেন আরও বেশি করে ফিরে আসে মানুষের কাছে।


তিনি বিশ্বাস করতেন, শিল্পীর দায়িত্ব শুধু বিনোদন দেওয়া নয়। শিল্পীর দায়িত্ব মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলা। তাই তাঁর গান কখনো নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছে, কখনো আবার মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।


‘বিস্তীর্ণ পাড়রে’ থেকে ‘গঙ্গা’নদী ও মানুষের গল্প


ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টিতে নদী একটি বিশেষ প্রতীক। তাঁর বিখ্যাত গান ‘বিস্তীর্ণ পাড়রে’ অসমের ব্রহ্মপুত্রকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এর আবেগ কোনো একটি নদীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নদী এখানে মানুষের জীবন, সময়, সভ্যতা ও পরিবর্তনের প্রতীক।


নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী মানুষের জীবন, তাদের আশা-হতাশা, বেঁচে থাকার সংগ্রাম সবকিছুই তাঁর গানে নতুন অর্থ পেয়েছে।


পরে তাঁর গান বাংলা ভাষাতেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘গঙ্গা’কে ঘিরে তাঁর সৃষ্টি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যেও গভীর সাড়া জাগায়। নদী তাঁর কাছে কেবল জলধারা ছিল না; নদী ছিল ইতিহাসের সাক্ষী, মানুষের কান্নার সাক্ষী, সভ্যতার চলমানতার প্রতীক।


এই কারণেই তাঁর গান অসম থেকে বাংলায়, ভারত থেকে বাংলাদেশে—ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।


বাংলা সংগীতে ভূপেনের আলাদা অবস্থান


বাংলা ভাষার সঙ্গে ভূপেন হাজারিকার সম্পর্ক ছিল গভীর ও আত্মিক। তিনি বাংলা ভাষায় গান গেয়েছেন, গান লিখেছেন এবং সুর দিয়েছেন। তাঁর কণ্ঠে বাংলা গান পেয়েছে এক বিশেষ মাত্রা।


বাংলাদেশের শ্রোতাদের কাছেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। তাঁর গান এ দেশের মানুষের আবেগ, জীবন ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সহজেই মিশে গেছে। বিশেষ করে মানবতা, ভালোবাসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রোতাদের কাছে আবেদন ধরে রেখেছে।


তাঁর কণ্ঠের বিশেষত্ব ছিল সেখানে কৃত্রিমতা ছিল না। ছিল গভীর মাটির টান। ছিল জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা এক ধরনের দৃঢ়তা। ফলে তাঁর গান শুনলে মনে হতো, কোনো দূরের শিল্পী গান করছেন না; বরং আমাদেরই জীবনের কোনো কথা কেউ অত্যন্ত আপন করে বলে যাচ্ছেন।


শুধু শিল্পী নন, চলচ্চিত্রকারও


ভূপেন হাজারিকা ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী। সংগীতের পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। অসমিয়া চলচ্চিত্রে তিনি নতুন ভাবনা ও নান্দনিকতার পরিচয় দেন।


চলচ্চিত্রকে তিনি শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। মানুষের জীবন, সামাজিক বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে তুলে ধরার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করেছেন।


তাঁর সৃষ্টিশীলতার এই বহুমুখিতা তাঁকে অন্য অনেক শিল্পীর চেয়ে আলাদা করে তুলেছে। গান, সুর, চলচ্চিত্র, লেখা—সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের সমাজ ও মানুষের কথা বলার চেষ্টা করেছেন।


সুরের আড়ালে ছিল সমাজের আয়না


ভূপেন হাজারিকার গানকে কেবল সংগীত দিয়ে বিচার করলে তাঁর সৃষ্টির বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। তাঁর গানের ভেতরে ছিল সমাজবীক্ষা। ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতা। ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর সহমর্মিতা।


তিনি দেখেছেন দারিদ্র্য, বৈষম্য, শোষণ ও মানুষের সংগ্রাম। সেসব অভিজ্ঞতা তাঁর সৃষ্টিকে করেছে জীবনঘনিষ্ঠ।


তাঁর গান কখনো প্রতিবাদের ভাষা, কখনো ভালোবাসার ভাষা, কখনো আবার আত্মপরিচয়ের ভাষা হয়ে উঠেছে। এ কারণেই তাঁর গান শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য জনপ্রিয় হয়নি; সময় বদলালেও তার বক্তব্য পুরোনো হয়ে যায়নি।


সীমান্তের ওপারে এক সেতুবন্ধন


ভূপেন হাজারিকার সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি হলো তিনি সংস্কৃতির মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন।


অসমিয়া, বাংলা ও হিন্দি বিভিন্ন ভাষায় কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, ভাষা আলাদা হলেও মানুষের অনুভূতি এক। মানুষের কান্নার ভাষা এক, ভালোবাসার ভাষা এক, স্বপ্নের ভাষাও এক।


ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর উপস্থিতি তাই শুধু একজন গায়ক বা সুরকারের উপস্থিতি ছিল না; তিনি ছিলেন এক সাংস্কৃতিক সেতু।


বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর গানের যে আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, তা আজও অটুট। তাঁর গান এ দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পী ও শ্রোতাকে অনুপ্রাণিত করেছে।


পুরস্কার ও স্বীকৃতির দীর্ঘ তালিকা


সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ভূপেন হাজারিকা জীবদ্দশায় পেয়েছেন বহু সম্মাননা। সংগীত ও সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ভারতের জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে সম্মানিত হন।


জীবনের শেষ পর্বে এসে তাঁর অবদান আরও ব্যাপকভাবে স্বীকৃতি পায়। মৃত্যুর পরও তাঁকে দেওয়া হয় ভারতের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন।


তবে পুরস্কার বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি তাঁর শিল্পীসত্তার প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে না। তাঁর সবচেয়ে বড় পুরস্কার ছিল মানুষের ভালোবাসা। যে ভালোবাসা তাঁর মৃত্যুর পরও কমেনি।


আজও কেন এত প্রাসঙ্গিক ভূপেন হাজারিকা?


সময়ের সঙ্গে গান বদলায়, শ্রোতার রুচি বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু মানুষের মৌলিক অনুভূতি বদলায় না। মানুষ আজও ভালোবাসে, কাঁদে, হারায়, স্বপ্ন দেখে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। আর এই চিরন্তন মানবিক অনুভূতিগুলোই ছিল ভূপেন হাজারিকার সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু।


তাই নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁর গান অচেনা নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও নতুন সংগীতের যুগেও তাঁর গান ফিরে আসে নানা আয়োজনে। নতুন শিল্পীরা তাঁর গান গেয়ে তাঁকে স্মরণ করেন। পুরোনো শ্রোতারা স্মৃতির ভেতর ফিরে যান তাঁর কণ্ঠে।


একজন শিল্পীর সাফল্য তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তাঁর সৃষ্টিকে সময়ের সঙ্গে নতুন করে আবিষ্কার করে পরবর্তী প্রজন্ম। ভূপেন হাজারিকা সেই বিরল শিল্পীদের একজন।


চলে গেছেন মানুষটি, রয়ে গেছে কণ্ঠ


২০১১ সালের ৫ নভেম্বর ভূপেন হাজারিকার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু হয়নি। বরং তাঁর প্রয়াণের পর তাঁর গান আরও বেশি করে মানুষের কাছে ফিরে এসেছে।


আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হয়তো তাঁর গান শোনা, তাঁর মানবতাবাদী দর্শনকে মনে রাখা এবং মানুষকে ভালোবাসার সেই আহ্বানকে নিজের জীবনে ধারণ করা।


ভূপেন হাজারিকা ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি নিজের জন্য গান করেননি শুধু। তিনি গান গেয়েছেন মানুষের জন্য। তাঁর কণ্ঠে উঠে এসেছে নদী, মাটি, শ্রমজীবী মানুষ, প্রেম, বেদনা, প্রতিবাদ ও মানবতার গল্প।


তাঁর গান তাই কোনো একটি দেশের সম্পদ নয়, কোনো একটি ভাষার সম্পদ নয়। তাঁর গান দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ।


আজ ৮ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করতে গিয়ে তাই বারবার ফিরে আসে তাঁর গানের সেই অমর বাণী মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়াক, মানুষ মানুষকে ভালোবাসুক।


ভূপেন হাজারিকা নেই। কিন্তু তাঁর কণ্ঠ আছে। তাঁর গান আছে। আর যত দিন মানুষ মানুষের জন্য ভালোবাসা খুঁজবে, তত দিন ভূপেন হাজারিকার গানও বেঁচে থাকবে নদীর স্রোতের মতো, মাটির গন্ধের মতো, মানুষের হৃদয়ের গভীরে।