
ছবি এ আই দিয়ে তৈরি
একটি মানুষ হাঁটছে। কথা বলছে। হাসছে। চারপাশ দেখছে। খাবার খাচ্ছে। আবার রাতে ঘুমিয়ে পড়ছে। বাইরে থেকে সবকিছুই স্বাভাবিক। অথচ এই স্বাভাবিকতার আড়ালে শরীরের ভেতরে চলছে এক অভাবনীয় কর্মযজ্ঞ। বুকের ভেতর হৃদ্যন্ত্র অবিরাম রক্ত পাম্প করছে, ফুসফুস বাতাস থেকে অক্সিজেন সংগ্রহ করছে, মস্তিষ্ক কোটি কোটি সংকেত বিশ্লেষণ করছে, কিডনি রক্ত পরিশোধন করছে, রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে। কোথাও ক্ষত তৈরি হলে শরীর নিজেই শুরু করছে মেরামতের কাজ।
কোনো সুইচ টিপতে হয় না। কোনো সফটওয়্যার আপডেট দিতে হয় না। কোনো প্রকৌশলী পাশে বসে নির্দেশ দেন না।
মানব শরীর নিজেই যেন একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বনিয়ন্ত্রিত ও অভিযোজনক্ষম প্রযুক্তি।
মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত কম্পিউটার বানিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে, মহাকাশযান পাঠিয়েছে দূর গ্রহের দিকে। কিন্তু নিজের শরীরের ভেতরে চলা এই জটিল ব্যবস্থার পূর্ণ রহস্য এখনো বিজ্ঞানও উন্মোচন করতে পারেনি।
মাত্র কয়েক কেজি নয়, এক বিশাল জৈব জগৎ
মানবদেহকে বাইরে থেকে দেখলে একটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব। কিন্তু মাইক্রোস্কোপের নিচে তাকালে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পৃথিবী। মানুষের শরীর গঠিত প্রায় ৩০ ট্রিলিয়ন মানবকোষ দিয়ে। প্রতিটি কোষের রয়েছে নিজস্ব কাঠামো, কাজ ও রাসায়নিক কার্যক্রম। আবার শরীরে বসবাস করে বিপুলসংখ্যক অণুজীব, যাদের অনেকেই শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একটি কোষের ভেতরেই রয়েছে এমন সব ব্যবস্থা, যা শক্তি উৎপাদন, প্রোটিন তৈরি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের পরিবর্তনে সাড়া দেওয়ার মতো অসংখ্য কাজ করে।
অর্থাৎ মানুষের শরীর আসলে একটি মাত্র ‘যন্ত্র’ নয়; এটি কোটি কোটি ক্ষুদ্র ইউনিটের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক বিশাল জীবন্ত ব্যবস্থা।
হৃদ্যন্ত্র: ঘুম নেই, ছুটি নেই
বুকের ভেতরে মুষ্টিবদ্ধ হাতের মতো দেখতে অঙ্গটি প্রতিদিন আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি করে চলেছে—রক্ত সঞ্চালন।
বিশ্রামের সময় একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হৃদ্যন্ত্র সাধারণত মিনিটে প্রায় ৬০ থেকে ১০০ বার স্পন্দিত হয়। প্রতিটি স্পন্দনে রক্ত শরীরের বিভিন্ন অংশে পৌঁছে যায়। রক্তের সঙ্গে কোষে পৌঁছায় অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি; আবার কোষের তৈরি বর্জ্য পদার্থও পরিবাহিত হয়ে যায় নির্দিষ্ট অঙ্গে।
হৃদ্যন্ত্রের আরও বিস্ময়কর দিক হলো এর নিজস্ব বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা। বিশেষ ধরনের কোষ থেকে উৎপন্ন বৈদ্যুতিক সংকেত হৃদ্যন্ত্রের পেশিকে ছন্দময়ভাবে সংকুচিত হতে সাহায্য করে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান হৃদ্যন্ত্রের কাজ অনুকরণ করে কৃত্রিম পাম্প ও পেসমেকার তৈরি করেছে। কিন্তু জীবন্ত হৃদ্যন্ত্রের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের কার্যক্রম সামঞ্জস্য করার ক্ষমতা এখনো অনুকরণ করা অত্যন্ত কঠিন।
মস্তিষ্ক: শরীরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ
মানব শরীরের সবচেয়ে রহস্যময় অঙ্গগুলোর একটি মস্তিষ্ক। ওজন মাত্র প্রায় দেড় কেজি, কিন্তু এর ভেতরে রয়েছে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন।
চোখে দেখা, কানে শোনা, স্পর্শ অনুভব, কথা বলা, হাঁটা, স্মৃতি তৈরি, সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভয় পাওয়া, আনন্দ অনুভব—সবকিছুর সঙ্গে মস্তিষ্কের জটিল কার্যক্রম জড়িত।
নিউরনগুলো বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এই যোগাযোগব্যবস্থা এতটাই জটিল যে মানুষের তৈরি কোনো একক কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সঙ্গে এর সরাসরি তুলনা করা কঠিন। আর সবচেয়ে বড় রহস্য চেতনা।
আমরা কীভাবে ‘আমি’ বলে নিজেকে অনুভব করি? কীভাবে একটি স্মৃতি মনের মধ্যে ছবি হয়ে ফিরে আসে? কীভাবে একটি শব্দের অর্থ বুঝি কিংবা একটি দৃশ্য দেখে আবেগ অনুভব করি?
বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু এসব প্রশ্নের সব উত্তর এখনো মেলেনি।
চোখ: ক্যামেরার চেয়েও জটিল
মানুষের চোখকে প্রায়ই ক্যামেরার সঙ্গে তুলনা করা হয়। কিন্তু চোখ কেবল ছবি তোলে না; এটি আলোর তথ্য সংগ্রহ করে এবং তা স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে মস্তিষ্কে পাঠায়।
চোখের রেটিনায় থাকা আলোকসংবেদী কোষ আলোকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে। এরপর মস্তিষ্ক সেই সংকেত বিশ্লেষণ করে তৈরি করে দৃশ্যের অভিজ্ঞতা।
অর্থাৎ, চোখ দেখে না একা চোখ তথ্য সংগ্রহ করে, মস্তিষ্ক সেই তথ্যকে ‘দেখা’তে পরিণত করে।
মানুষের চোখ আলো ও অন্ধকারের পার্থক্য বুঝতে পারে, বিভিন্ন রঙ শনাক্ত করতে পারে এবং চলমান বস্তুর পরিবর্তনও ধরতে পারে। ক্যামেরা এসব কাজের কিছু করতে পারলেও মানুষের দৃষ্টিব্যবস্থার সঙ্গে তার তুলনা এখনো সীমিত।
ফুসফুস: বাতাস থেকে জীবনের জ্বালানি
প্রতিটি শ্বাস যেন একেকটি ছোট্ট জৈবিক অভিযান।
ফুসফুসে প্রবেশ করা বাতাস ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়ুথলিতে পৌঁছায়। সেখানে অক্সিজেন রক্তে প্রবেশ করে এবং রক্তের কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়ে আসে।
আমরা চাইলে কিছু সময় শ্বাস আটকে রাখতে পারি। কিন্তু দীর্ঘ সময় তা সম্ভব নয়। কারণ শরীরের কোষগুলোকে অবিরত শক্তি উৎপাদন করতে হয় এবং বিপাকের ফলে তৈরি কার্বন ডাই-অক্সাইডও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয় না। মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্বাসের গতি ও গভীরতা সামঞ্জস্য করে।
কিডনি: শরীরের নিজস্ব পরিশোধনাগার
প্রতিদিন শরীরে অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এসব প্রক্রিয়ার ফলে বর্জ্যও তৈরি হয়। শরীরের দুই কিডনি সেই বর্জ্য অপসারণ ও তরল-লবণের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কিডনি রক্ত ছেঁকে প্রয়োজনীয় উপাদান শরীরে ধরে রাখে এবং অপ্রয়োজনীয় পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেয়।
শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়—রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা এবং হাড়ের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু হরমোন ও রাসায়নিক ব্যবস্থাপনাতেও কিডনির ভূমিকা রয়েছে।
ত্বক: শরীরের জীবন্ত বর্ম
মানব শরীরের সবচেয়ে বড় অঙ্গ ত্বক। এটি শুধু শরীরকে ঢেকে রাখে না; বরং বাইরের পরিবেশ ও শরীরের ভেতরের জগতের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা-প্রাচীর হিসেবে কাজ করে।
জীবাণু, রাসায়নিক পদার্থ, আঘাত—বিভিন্ন ঝুঁকি থেকে ত্বক শরীরকে রক্ষা করে। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণেও এর ভূমিকা রয়েছে।
আর কোথাও কেটে গেলে শুরু হয় আরেক বিস্ময়কর প্রক্রিয়া। রক্ত জমাট বাঁধে, ক্ষতস্থানে বিভিন্ন কোষ সক্রিয় হয়, নতুন টিস্যু তৈরি হতে থাকে। অর্থাৎ শরীরের রয়েছে নিজস্ব ‘রিপেয়ার সিস্টেম’।
মানুষ ক্ষত সারানোর জন্য ব্যান্ডেজ তৈরি করেছে; কিন্তু ক্ষত সারানোর মূল প্রযুক্তি শরীরের নিজেরই।
রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা: শরীরের অদৃশ্য সেনাবাহিনী
আমাদের চারপাশে অসংখ্য অণুজীব। শরীর প্রতিনিয়ত তাদের সংস্পর্শে আসে। তাদের মধ্যে কিছু ক্ষতিকর। সেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা।
শ্বেত রক্তকণিকা, অ্যান্টিবডি এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিরোধকোষ মিলে তৈরি করে এক বিশাল প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক।
কোনো জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে প্রতিরোধব্যবস্থা তাকে শনাক্ত করে প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে আগের সংক্রমণের তথ্যও প্রতিরোধব্যবস্থা মনে রাখে। টিকার কার্যকারিতার পেছনেও রয়েছে এই স্মৃতিনির্ভর প্রতিরোধক্ষমতা।
অর্থাৎ শরীর শুধু বর্তমান বিপদের মোকাবিলা করে না; ভবিষ্যৎ আক্রমণের জন্যও প্রস্তুত হতে পারে।
ডিএনএ: শরীরের গোপন নকশা
মানবদেহের প্রতিটি কোষের ভেতরে থাকা ডিএনএ যেন একটি বিশাল নির্দেশনাপত্র। এতে থাকে বংশগত তথ্য এবং শরীরের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও জৈবিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পর্কিত নির্দেশনা।
ডিএনএর গঠন এত সূক্ষ্ম অথচ তথ্যবহুল যে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে এর রহস্য উন্মোচনে কাজ করছেন। আজ জেনেটিক গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি, বংশগত বৈশিষ্ট্য এবং কোষের কার্যক্রম সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি জানতে পারছেন।
তবু জীবনের এই ‘কোড’-এর সব রহস্য এখনো জানা হয়নি।
ঘুমের মধ্যেও চলছে কারখানা
রাত নামলে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু শরীর ঘুমিয়ে পড়ে না।
ঘুমের সময় মস্তিষ্কের বিভিন্ন কার্যক্রম অব্যাহত থাকে। স্মৃতি প্রক্রিয়াকরণ, শেখা, শরীরের পুনরুদ্ধার এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
অর্থাৎ ঘুম শরীরের ‘বন্ধ’ হয়ে যাওয়া নয়; বরং এক ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্গঠন পর্ব।
মানুষ প্রযুক্তি বানায়, আবার প্রযুক্তির অনুপ্রেরণাও নেয় শরীর থেকেই
আধুনিক প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রেই মানব শরীর বিজ্ঞানীদের অনুপ্রেরণা দিয়েছে। কৃত্রিম অঙ্গ, বায়োনিক হাত-পা, রোবটিক সার্জারি, নিউরাল নেটওয়ার্ক, কৃত্রিম হৃদ্যন্ত্র—সবখানেই মানবদেহের কার্যপ্রণালি বোঝার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মানুষ এখন এমন যন্ত্র তৈরি করছে, যা মানুষের মস্তিষ্কের কিছু বৈশিষ্ট্য অনুকরণ করতে পারে। তৈরি হচ্ছে স্মার্ট প্রস্থেটিক অঙ্গ, যা স্নায়ুর সংকেতের সঙ্গে কাজ করতে পারে। কিন্তু স্বাভাবিক মানবদেহের সম্পূর্ণ বহুমাত্রিক ক্ষমতার সমতুল্য প্রযুক্তি এখনো অনেক দূরের বিষয়।
শেষ কথা: সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রযুক্তি আমাদের সঙ্গেই আছে
আমরা প্রতিদিন স্মার্টফোনের প্রযুক্তিতে বিস্মিত হই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দেখে অবাক হই। মহাকাশযান দেখে মুগ্ধ হই। কিন্তু নিজের শরীরের দিকে তাকালে হয়তো আরও বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছে।
একটি হৃদ্যন্ত্র সারাক্ষণ কাজ করছে। ফুসফুস বাতাস থেকে জীবনধারণের উপাদান সংগ্রহ করছে। কিডনি রক্ত পরিশোধন করছে। মস্তিষ্ক কোটি কোটি সংকেত বিশ্লেষণ করছে। রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ছে। ক্ষত হলে শরীর নিজেই মেরামত শুরু করছে। আর এসবের সমন্বয়ে একজন মানুষ হাঁটছে, ভাবছে, ভালোবাসছে, স্বপ্ন দেখছে।
মানব শরীর তাই শুধু একটি জীবন্ত কাঠামো নয় এটি প্রকৃতির সবচেয়ে বিস্ময়কর জৈব প্রযুক্তিগুলোর একটি।
মানুষ যতই নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করুক, নিজের শরীরকে বোঝার অভিযান হয়তো শেষ হবে না। কারণ আমরা যে শরীরকে প্রতিদিন সঙ্গে নিয়ে চলি, তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এমন এক জগৎ যার অনেক রহস্য বিজ্ঞান জানে, আর অনেক রহস্য এখনো অজানা।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই মহাবিস্ময়কর ‘প্রযুক্তি’টি আমাদের বাইরে কোথাও নয় আমাদের নিজেদের শরীরের ভেতরেই।