
একসময় আকাশে উড়তে হলে মানুষের প্রয়োজন হতো বিমান বা হেলিকপ্টারের। এখন সেই আকাশে ছোট ছোট চালকবিহীন উড়োজাহাজ নিয়মিতভাবে নানা কাজ করছে। ছবি ও ভিডিও ধারণ থেকে শুরু করে কৃষিজমিতে কীটনাশক ছিটানো, দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান এবং শিল্পকারখানার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে ড্রোন এখন শুধু একটি উড়ন্ত ক্যামেরা নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিপিএস, উন্নত সেন্সর, ক্যামেরা ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার সমন্বয়ে ড্রোন ক্রমেই হয়ে উঠছে একটি বহুমুখী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম। অনেক ক্ষেত্রে মানুষের ঝুঁকিপূর্ণ বা সময়সাপেক্ষ কাজও ড্রোনের মাধ্যমে কম সময়ে করা সম্ভব হচ্ছে।
ড্রোন মূলত এমন একটি চালকবিহীন আকাশযান, যা দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় অথবা নির্দিষ্ট সফটওয়্যার ও সেন্সরের মাধ্যমে আংশিক বা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালিত হতে পারে। এর প্রচলিত নাম ইউএভি বা আনম্যানড এরিয়াল ভেহিকল।
ড্রোনের আকার, ওজন, গতি ও সক্ষমতা একেক ধরনের। ছোট ড্রোন সাধারণত ছবি ও ভিডিও ধারণ, নজরদারি কিংবা বিনোদনের কাজে ব্যবহৃত হয়। তুলনামূলক বড় ড্রোনে বিভিন্ন ধরনের সেন্সর, ক্যামেরা ও মালামাল বহনের ব্যবস্থা থাকতে পারে।
বর্তমানে অনেক ড্রোনে জিপিএস, বাধা শনাক্তকারী সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ছবি বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দিষ্ট পথে চলার প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। ফলে একজন অপারেটর দূর থেকে ড্রোন পরিচালনা করলেও এর অনেক কাজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।
কৃষি খাতে ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার সবচেয়ে দ্রুত বিস্তৃত ক্ষেত্রগুলোর একটি। বড় কৃষিজমি পর্যবেক্ষণ করতে কৃষক বা কৃষি কর্মকর্তাদের দীর্ঘ সময় মাঠে ঘুরতে হয়। ড্রোন ব্যবহার করে অল্প সময়ে ওপর থেকে পুরো জমির ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা সম্ভব।
বিশেষ ক্যামেরা ব্যবহার করে জমির কোথায় ফসলের বৃদ্ধি কম, কোথায় পানির ঘাটতি রয়েছে বা কোন অংশে রোগের আক্রমণ হয়েছে, তা শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এতে কৃষক জমির সব অংশে একই মাত্রায় সার বা কীটনাশক প্রয়োগ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন।
ড্রোনের মাধ্যমে কীটনাশক ও তরল সার ছিটানোর কাজও করা হচ্ছে। এতে শ্রমিকের শারীরিক ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় প্রয়োজনীয় পরিমাণে উপকরণ প্রয়োগ করা সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম, জলাবদ্ধ বা কাদাযুক্ত জমিতে এ ধরনের প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে জমির পরিমাণ সীমিত হলেও কৃষিকাজে শ্রম ও উৎপাদন খরচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ড্রোন কৃষিতে সময় ও শ্রম সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস বা অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগের সময় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দুর্গম এলাকা বা পানিবন্দী স্থানে মানুষের পক্ষে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ড্রোন ব্যবহার করে ওপর থেকে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সংগ্রহ করা যায়।
বন্যার সময় কোন সড়ক বা এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে, কোথায় মানুষ আটকা পড়েছে কিংবা কোন সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা দ্রুত শনাক্ত করতে ড্রোন সহায়তা করতে পারে। উদ্ধারকারী দল সেই তথ্য ব্যবহার করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করতে পারে।
অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রেও ড্রোনের মাধ্যমে আগুনের বিস্তৃতি ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। থার্মাল ক্যামেরা যুক্ত ড্রোন ব্যবহার করে তাপের উৎস শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ফলে মানুষের সরাসরি প্রবেশ ঝুঁকিপূর্ণ এমন এলাকাতেও পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
দুর্গম এলাকায় জরুরি চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন দেশে পরীক্ষা ও ব্যবহার চলছে। রক্ত, ওষুধ কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দিতে ড্রোন ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
যেসব এলাকায় সড়ক যোগাযোগ দুর্বল বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, সেখানে ড্রোনের মাধ্যমে ছোট আকারের জরুরি সামগ্রী পাঠানো যেতে পারে। এতে প্রচলিত যানবাহনের তুলনায় দ্রুত সেবা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।
তবে চিকিৎসাক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহারের জন্য নিরাপত্তা, বহনক্ষমতা, আবহাওয়া, উড্ডয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং পণ্যের সুরক্ষার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
বড় ভবন, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেললাইন ও সড়ক নির্মাণের কাজ পর্যবেক্ষণেও ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে। নির্মাণাধীন স্থাপনার ওপর দিয়ে ড্রোন উড়িয়ে নিয়মিত ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করা যায়। এতে কাজের অগ্রগতি তুলনা করা সহজ হয়।
উঁচু ভবনের দেয়াল বা সেতুর এমন কিছু অংশ রয়েছে, যেখানে মানুষের সরাসরি পৌঁছানো কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। ড্রোনের ক্যামেরা দিয়ে এসব অংশের ছবি সংগ্রহ করে সম্ভাব্য ক্ষতি শনাক্ত করা যেতে পারে।
জমির পরিমাপ, মানচিত্র তৈরি এবং নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণেও ড্রোন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এতে প্রকৌশলী ও প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রয়োজনীয় তথ্য দ্রুত পাওয়া সম্ভব হয়।
ড্রোনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যবহারগুলোর একটি হলো ছবি ও ভিডিও ধারণ। আগে আকাশ থেকে দৃশ্য ধারণ করতে হেলিকপ্টার বা বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন হতো। এখন তুলনামূলক কম খরচে ড্রোনের মাধ্যমে ওপর থেকে আকর্ষণীয় ছবি ও ভিডিও ধারণ করা সম্ভব।
সংবাদমাধ্যমে কোনো ঘটনা, জনসমাগম, বন্যা, নদীভাঙন, অগ্নিকাণ্ড কিংবা প্রাকৃতিক দৃশ্যের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরতে ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন, পর্যটন ও বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্রেও এর ব্যবহার ব্যাপক।
তবে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরে অনুমতি ছাড়া ড্রোন উড়িয়ে ছবি বা ভিডিও ধারণ করা অনেক ক্ষেত্রে আইনগত ও নৈতিক প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বড় শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, খনি বা বিশাল গুদাম এলাকায় নিয়মিত নজরদারির জন্য ড্রোন ব্যবহার করা যেতে পারে। বিস্তৃত এলাকা দ্রুত পর্যবেক্ষণ করা এর অন্যতম সুবিধা।
সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের হাজার হাজার প্যানেলের মধ্যে কোনো অংশে সমস্যা দেখা দিয়েছে কি না, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের কোথাও ক্ষতি হয়েছে কি না কিংবা কোনো শিল্প স্থাপনার নির্দিষ্ট অংশে অস্বাভাবিক তাপমাত্রা তৈরি হয়েছে কি না, তা বিশেষ সেন্সরযুক্ত ড্রোনের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পাঠানোর প্রয়োজন কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা করা সহজ হতে পারে।
অনলাইন বাণিজ্যের বিস্তারের সঙ্গে দ্রুত পণ্য সরবরাহের জন্য ড্রোন ব্যবহারের ধারণাও গুরুত্ব পাচ্ছে। ছোট ও হালকা পণ্য নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ড্রোন ব্যবহার নিয়ে বিভিন্ন দেশে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
বিশেষ করে যানজটপূর্ণ শহর বা দুর্গম এলাকায় নির্দিষ্ট শর্তে ড্রোন সরবরাহব্যবস্থায় যুক্ত হতে পারে। তবে মানুষের মাথার ওপর দিয়ে উড্ডয়ন, পণ্য নিরাপত্তা, আবহাওয়া, ব্যাটারির সক্ষমতা এবং উড্ডয়নপথ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো সমাধান করা প্রয়োজন।
ড্রোন প্রযুক্তির পরবর্তী বড় পরিবর্তন আসছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারে। শুধু ক্যামেরায় ছবি ধারণের পরিবর্তে এখন ড্রোনের সংগৃহীত ছবি বিশ্লেষণ করে নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিবর্তন শনাক্ত করার প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় কোনো এলাকায় যানবাহনের সংখ্যা গণনা, ফসলের অবস্থা বিশ্লেষণ, নির্দিষ্ট বস্তুর অবস্থান শনাক্ত কিংবা অবকাঠামোর ক্ষতি চিহ্নিত করার মতো কাজ করা সম্ভব হতে পারে।
ভবিষ্যতে ড্রোন আরও বেশি স্বয়ংক্রিয় হলে একজন অপারেটর একাধিক ড্রোনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। এতে ড্রোনের ব্যবহার আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
ড্রোন প্রযুক্তির সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো নিরাপত্তা। নিয়ন্ত্রণ হারানো ড্রোন মানুষের ওপর পড়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে বা বিমান চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গোপনীয়তাও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ক্যামেরাযুক্ত ড্রোন সহজেই ব্যক্তিগত বাড়ি, প্রতিষ্ঠান বা মানুষের ছবি ধারণ করতে পারে। তাই দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে আইন ও নীতিমালা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ড্রোন পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল, পর্যাপ্ত ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো প্রয়োজন। বড় ড্রোনের ক্ষেত্রে উড্ডয়ন অনুমতি ও আকাশপথ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, নির্মাণ, সংবাদ সংগ্রহ ও নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। নদীভাঙন, বন্যা, উপকূলীয় দুর্যোগ এবং বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পর্যবেক্ষণে এই প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।
তবে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ উড্ডয়ন, প্রশিক্ষণ, গোপনীয়তা সুরক্ষা এবং আইন মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, এর ব্যবহারের ক্ষেত্রও তত বাড়বে। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে।
সব মিলিয়ে ড্রোন প্রযুক্তি শুধু আকাশে উড়ন্ত একটি যন্ত্র নয়, বরং তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, পরিবহন ও স্বয়ংক্রিয় কাজের নতুন অবকাঠামো হিসেবে সামনে আসছে। কৃষকের জমি থেকে শুরু করে দুর্যোগকবলিত এলাকা, নির্মাণ প্রকল্প থেকে শিল্পকারখানা, চিকিৎসা সেবা থেকে সংবাদ সংগ্রহ, নানা ক্ষেত্রে এর ব্যবহার মানুষের কাজের ধরন বদলে দিতে পারে।
প্রযুক্তির ভবিষ্যতে ড্রোন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা নির্ভর করবে এর নিরাপদ, আইনসম্মত ও কার্যকর ব্যবহারের ওপর। যথাযথ নীতিমালা, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা গেলে ড্রোন বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনসেবার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে।