
১২ প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতা-কর্মীদের নিয়োগ, নির্বাচন কমিশনেও দলীয় সংশ্লিষ্টতার ব্যক্তিকে বসানোর অভিযোগ
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল বিএনপি। দলটির নির্বাচনী অঙ্গীকারে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে সততা, মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
The Daily Star-এর ২৯ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার একদিনেই ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ১২ জন বিএনপি নেতা ও কর্মীকে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে ১১টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে।
এক নজরে নিয়োগ পাওয়া ১২ জন
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২৩ জুলাই ২০২৬-এর নিয়োগে—
মামুন হাসান — বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন।
আব্দুল খালেক — বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন।
শামসুজ্জামান — বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন।
সালাহউদ্দিন সরকার — জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা; মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন।
মো. মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল — বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন।
আব্দুল বারী — বিএনপির সহকারী ধর্মবিষয়ক সম্পাদক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (BIWTC)।
কাজী রাওনাকুল ইসলাম — বিএনপির সহকারী বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, BCCT।
জাকির হোসেন — সাবেক যুবদল সহ-সভাপতি; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড।
মোহাম্মদ রাশেদুল হক — বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড।
মো. কামরুজ্জামান — সাবেক যুবদল সহ-সভাপতি; নির্বাহী সচিব, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ।
বেনজীর আহমেদ — বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহকারী সাংগঠনিক সম্পাদক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন।
শামসুল আলম — সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা এবং ২০২৫ সালে বিএনপির নির্বাচনী সীমানা পর্যালোচনা কমিটির সদস্য; নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব।
নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ ঘিরে বেশি প্রশ্ন
১২টি নিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে শামসুল আলমের নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব পদে নিয়োগ নিয়ে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শামসুল আলম সাবেক নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তা এবং ২০২৫ সালে বিএনপির একটি নির্বাচনী সীমানা পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ছিলেন। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কার্যক্রমের আগে নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তির নিয়োগ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে বলে সমালোচকদের মত।
দলীয় পদে থেকেও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব?
আরও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি নিয়োগের সময়ও বিএনপির বিভিন্ন রাজনৈতিক পদে ছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৩ আগস্ট The Daily Star-এর এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়, সরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ পদে মোট ১৭ জন বর্তমান ও সাবেক বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন নিয়োগের সময়ও দলীয় পদে ছিলেন বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়।
এতে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে, একজন ব্যক্তি একই সময়ে ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্বে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থাকলে তাঁর প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব?
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল। নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়।
কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যখন ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতা, সাংগঠনিক নেতা, সম্পাদক এবং অঙ্গসংগঠনের সাবেক ও বর্তমান নেতাদের দেখা যাচ্ছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—
রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা প্রধান বিবেচনা, নাকি রাজনৈতিক পরিচয়ও বড় ভূমিকা রাখছে?
‘শুধু সরকার বদলেছে, সংস্কৃতি কি বদলায়নি?’
বিএনপি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের অভিযোগ করে এসেছে। সেই বিএনপি সরকারের আমলেই যদি একই ধরনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক—শুধু ক্ষমতাসীন দলের নাম পরিবর্তন হয়েছে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিও পরিবর্তিত হয়েছে?
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এসব নিয়োগের সমালোচনা করে বলেছেন, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এমন নিয়োগ পুরনো ‘winner-takes-all’ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি
সমালোচকদের মতে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পদে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পরিবর্তন হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পেশাদারিত্ব ও স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক কল্যাণ সংস্থা এবং পরিবহন ও শ্রম খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের উচিত এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার মানদণ্ড প্রকাশ করা এবং যাদের বিরুদ্ধে দলীয় পদে থাকার অভিযোগ রয়েছে, তাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা।
কারণ রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। সরকার আসে এবং যায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জনগণের।
বিএনপির সামনে এখন তাই বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ সরকারের কথিত দলীয়করণের বিরুদ্ধে যে দল দীর্ঘদিন রাজনৈতিক আন্দোলন করেছে, ক্ষমতায় এসে বিএনপি কি সেই একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি করছে?
এই প্রশ্নের উত্তর রাজনৈতিক বক্তব্যে নয়, বরং স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া, যোগ্যতার প্রমাণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমেই দিতে হবে।