
অভিবাসনের ইতিহাস মূলত স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সাফল্যের এক দীর্ঘ যাত্রার নাম। একজন অভিবাসী শুধু নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন না; তিনি একইসঙ্গে পরিবার, সমাজ এবং নতুন একটি কমিউনিটির ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিজের শেকড়, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে ধরে রেখে নতুন সমাজে অবদান রাখাই একজন সফল অভিবাসীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে মাত্র পঞ্চান্ন বছর আগে। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশের মানুষের অভিবাসনের ইতিহাসও স্বাধীনতার সময়কাল থেকেই শুরু। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশিদের অভিবাসনের সূচনাও সেই সময়ের কাছাকাছি।
গত শতাব্দীর ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে কয়েকজন মেধাবী ও জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। সংখ্যায় তারা ছিলেন অল্প, পরিচয়ে ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক। এত অল্পসংখ্যক মানুষ দিয়ে তখন কোনো সংগঠন গড়ে তোলার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত সেই অল্পসংখ্যক বাংলাদেশি একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাদের হাত ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশ পিপলস অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া’। প্রয়াত নজরুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠন অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের নাম ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরে।
নবগঠিত সংগঠনটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি করা এবং যুদ্ধপীড়িত মানুষের জন্য ওষুধ ও ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া।
স্বাধীনতার পর অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিরা আবারও সংগঠিত হন। যুদ্ধকালীন সংগঠনটিকে তারা একটি স্থায়ী সাংগঠনিক রূপ দেন। পরবর্তীতে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া। প্রয়াত নজরুল ইসলাম সংগঠনটির প্রথম সভাপতি এবং ফখরুদ্দিন চৌধুরী প্রথম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আজ অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটি সেই ছোট্ট সূচনা থেকে অনেক দূর এগিয়ে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা নিয়মিত কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, গবেষণা, শিক্ষা, অর্থনীতি, আইন ও ব্যবসা প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পেশাজীবীরা নিজেদের যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তিবিদরা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনীদের তালিকায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রবীন খুদার অন্তর্ভুক্তি প্রবাসী বাংলাদেশিদের সাফল্যের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে বাংলাদেশি চিকিৎসকরা অস্ট্রেলিয়ার স্বাস্থ্যসেবায় অবদান রাখছেন, প্রকৌশলীরা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করছেন এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ভূমিকা রাখছেন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, কমিউনিটি সেবা ও নাগরিক সমাজেও বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ানদের অংশগ্রহণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অর্থনৈতিক অবদানের পাশাপাশি বাংলাদেশি কমিউনিটি অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রবাসীরা নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ন রেখেছেন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের শেকড়ের পরিচয়।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিটির প্রয়োজনও পরিবর্তিত হয়েছে। আজকের বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান সমাজ শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা, সামাজিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গঠনের জন্য প্রয়োজন একটি স্থায়ী অবকাঠামো।
এই বাস্তবতায় একটি আধুনিক মাল্টিকালচারাল কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। এটি শুধু একটি ভবন নির্মাণের উদ্যোগ হবে না; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি জ্ঞান, সংস্কৃতি ও ঐক্যের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।
সিডনিতে বাংলাদেশি কমিউনিটির অসংখ্য সংগঠন নিয়মিত বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজন করে, যার জন্য প্রতিবারই বিভিন্ন স্থান ভাড়া নিতে হয়। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার উদ্যোগে একটি নিজস্ব কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হলে তা একদিকে যেমন কমিউনিটির দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা পূরণ করবে, অন্যদিকে একটি স্থায়ী আয়ের উৎস তৈরি করবে। সেই আয় দিয়ে মানবিক ও সামাজিক উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হওয়া উচিত অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত প্রবীণ বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ানদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা।
অস্ট্রেলিয়ার উন্নয়নে দীর্ঘদিন শ্রম, মেধা ও কর প্রদানের মাধ্যমে অবদান রাখা অনেক প্রবীণ বাংলাদেশি অবসর জীবনের একটি অংশ জন্মভূমিতে কাটাতে চান। এটি একটি স্বাভাবিক মানবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নীতিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই এ ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি হন।
তাদের অধিকার ও ন্যায্য স্বার্থ নিয়ে গঠনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা কোনো বিশেষ সুবিধা আদায়ের দাবি নয়; বরং অস্ট্রেলিয়ার উন্নয়নে অবদান রাখা একটি প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ববোধের প্রকাশ।
এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কার্যকর আলোচনা ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়ার বর্তমান সভাপতি মনিরুল হক জর্জ এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর ইসলাম বাবুর নেতৃত্বাধীন নির্বাহী কমিটি যদি এসব দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে, তাহলে সংগঠনটি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
একটি সংগঠনের প্রকৃত সাফল্য শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনের সংখ্যায় নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে, তার ওপর নির্ভর করে। ঐক্য, সহযোগিতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান কমিউনিটি আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে—যেখানে প্রবাসের মাটিতেও প্রতিফলিত হবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ ও স্বপ্ন।
লেখক- মোহাম্মাদ আব্দুল মতিন, সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও লেখক।