News update
  • কিশোর গ্যাং দমনে কুমিল্লায় সাঁড়াশি অভিযান: আটক ৬২৪     |     
  • এল নিনোর প্রভাবে ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা     |     
  • ভারতে স্লিপার বাসে ভয়াবহ আগুন, নিহত ৯     |     
  • বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন বিমান কেনার চুক্তি হয়েছে: মাহদী আমিন     |     
  • ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক     |     
বিনোদন ডেস্ক বিনোদন 2026-09-10, 7:22pm

অভিনয়ের মঞ্চে আজও অমর এটিএম শামসুজ্জামান

খলনায়ক থেকে কৌতুক, পার্শ্বচরিত্র থেকে প্রধান চরিত্র-বহুরূপী অভিনয়ে জয় করেছিলেন কোটি দর্শকের হৃদয়

a-t-m-samsuzzaman-f0bd1c29feaecac4f12e8b46dc14faae1789046543.jpg


বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু শিল্পীর নাম কেবল একটি প্রজন্মের সঙ্গে আটকে থাকে না। সময় বদলায়, দর্শকের রুচি বদলায়, প্রযুক্তি বদলায় কিন্তু তাদের অভিনীত চরিত্রগুলো থেকে যায় মানুষের স্মৃতিতে। তেমনই এক অবিস্মরণীয় নাম আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান যিনি দর্শকের কাছে পরিচিত এটিএম শামসুজ্জামান নামে।


আজ ১০ সেপ্টেম্বর এই কিংবদন্তি অভিনয়শিল্পীর জন্মদিন। ১৯৪১ সালের এই দিনে নোয়াখালীর দৌলতপুরে নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্মীপুরের ভোলাকোটের বড়বাড়ি। ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ৭৯ বছর বয়সে না ফেরার দেশে চলে গেলেও অভিনয়ের অসংখ্য চরিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন দর্শকের হৃদয়ে।


প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি কখনো খলনায়ক, কখনো কৌতুক অভিনেতা, কখনো কঠোর স্বভাবের চরিত্র, আবার কখনো আবেগঘন ও মানবিক চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। শুধু অভিনেতা হিসেবেই নয়, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা ও পরিচালক হিসেবেও রেখেছেন সৃজনশীলতার স্বাক্ষর।


লেখক হওয়ার স্বপ্ন থেকে অভিনয়ের জগতে


অভিনয়ে আসার শুরুটা সরাসরি অভিনয় দিয়ে নয়। চলচ্চিত্র নির্মাণের নেপথ্যে কাজ করতে করতেই ধীরে ধীরে অভিনয়ের জগতে তার প্রবেশ। ১৯৬১ সালে পরিচালক উদয়ন চৌধুরীর ‘বিষকন্যা’ চলচ্চিত্রে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। পরে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন শাখায় কাজ করতে করতে অভিনয়ে নিজের স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেন।


তার অভিনয়জীবনের বিশেষত্ব ছিল চরিত্রের বৈচিত্র্য। একটি চরিত্রে দর্শক তাকে দেখে ভয় পেয়েছেন, অন্য চরিত্রে হেসেছেন, আবার কোনো চরিত্রে আবেগে আপ্লুত হয়েছেন। চরিত্র যত ছোটই হোক, নিজের অভিনয়শৈলী দিয়ে সেটিকে স্মরণীয় করে তোলার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তার।


এই কারণেই এটিএম শামসুজ্জামান ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যার উপস্থিতি অনেক সময় পুরো দৃশ্যের আবহই বদলে দিত।


‘খলনায়ক’ পরিচয় পেরিয়ে বহুরূপী অভিনেতা


বাংলা চলচ্চিত্রে খলচরিত্রে অভিনয়ের জন্য ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেলেও এটিএম শামসুজ্জামানকে শুধু খলনায়ক হিসেবে দেখলে তার শিল্পীসত্তার বিশালতাই ছোট হয়ে যায়।


কৌতুক, পার্শ্বচরিত্র, সামাজিক চরিত্র কিংবা গম্ভীর চরিত্র প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে নতুন করে উপস্থাপন করেছেন। তার সংলাপ বলার ধরন, মুখভঙ্গি, কণ্ঠস্বর এবং শরীরী অভিনয় চরিত্রগুলোকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।


বিশেষ করে তার কৌতুক অভিনয় ছিল স্বতন্ত্র। সংলাপের মধ্যে সূক্ষ্ম হাস্যরস তৈরি করার পাশাপাশি মুখের অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষা দিয়ে তিনি দর্শকদের হাসিয়েছেন। আবার প্রয়োজন হলে একই শিল্পী কয়েক মুহূর্তের মধ্যে পর্দায় ভয়ংকর প্রতিপক্ষ হয়ে উঠতে পেরেছেন।


চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশনেও জনপ্রিয়


শুধু বড় পর্দায় নয়, টেলিভিশন নাটকেও এটিএম শামসুজ্জামানের উপস্থিতি ছিল শক্তিশালী। মঞ্চ, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন—অভিনয়ের বিভিন্ন মাধ্যমে নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি।


তার অভিনীত চরিত্রগুলোতে সাধারণ মানুষের জীবন, হাসি-কান্না, দ্বন্দ্ব, লোভ, রাগ, ভালোবাসা ও সামাজিক বাস্তবতার নানা দিক উঠে এসেছে। ফলে দর্শক তাকে কেবল একজন অভিনেতা হিসেবে নয়, পরিচিত জীবনের নানা চরিত্রের প্রতিনিধি হিসেবেও গ্রহণ করেছেন।


বাংলাদেশের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের দর্শকদের কাছে তার জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা।


নেপথ্যের সৃষ্টিশীল মানুষটিও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ


এটিএম শামসুজ্জামানের পরিচয় শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা ও পরিচালকও। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের সামনে যেমন তিনি আলো ছড়িয়েছেন, তেমনি নেপথ্যেও সৃজনশীল ভূমিকা রেখেছেন।


একজন অভিনয়শিল্পী যখন গল্প, চরিত্র ও সংলাপের ভেতরের জগৎ সম্পর্কে গভীরভাবে জানেন, তখন তার অভিনয়ে সেই উপলব্ধির ছাপ পড়ে। এটিএম শামসুজ্জামানের অভিনয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি স্পষ্ট ছিল। চরিত্রের মনস্তত্ত্ব বুঝে সংলাপ উপস্থাপন এবং পরিস্থিতির সঙ্গে অভিনয়ের মাত্রা বদলে নেওয়া ছিল তার বড় শক্তি।


পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি


দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন এটিএম শামসুজ্জামান। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন তিনি। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার তাকে ২০১৫ সালে একুশে পদক প্রদান করে।


রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতি তার দীর্ঘ ও বর্ণিল শিল্পীজীবনের অন্যতম বড় অর্জন। তবে পুরস্কারের বাইরেও দর্শকের ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।


পুরান ঢাকার গলি থেকে রুপালি পর্দা


এটিএম শামসুজ্জামানের বেড়ে ওঠার সঙ্গে পুরান ঢাকার স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। তিনি ঢাকার পগোজ স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শেষে জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন। পগোজ স্কুলে তার বন্ধু ছিলেন পরবর্তী সময়ের আরেক জনপ্রিয় অভিনেতা প্রবীর মিত্র।


পুরান ঢাকার সাংস্কৃতিক পরিবেশ, মানুষের বিচিত্র জীবনযাপন এবং চারপাশের নানা চরিত্র তার শিল্পীসত্তাকে সমৃদ্ধ করেছিল বলেও বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে।


চলে গেছেন, রেখে গেছেন অমর চরিত্র


২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এটিএম শামসুজ্জামানের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র হারায় বহুমাত্রিক এক অভিনয়শিল্পীকে।


তবে শিল্পীর মৃত্যু তার সৃষ্টিকে শেষ করে দিতে পারে না। এটিএম শামসুজ্জামানের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য। তার অভিনীত চরিত্রগুলো এখনো দর্শকের মনে জীবন্ত। নতুন প্রজন্মের দর্শকরাও পুরোনো চলচ্চিত্র ও নাটকের মাধ্যমে তার অভিনয় আবিষ্কার করছেন।


তার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল—তিনি চরিত্রকে নিজের মতো করে নিতেন না, বরং নিজেকে চরিত্রের মতো করে গড়ে তুলতেন। ফলে পর্দায় দেখা যেত একজন এটিএম শামসুজ্জামানকে নয়, দেখা যেত চরিত্রটিকেই।


জন্মদিনে স্মরণ কিংবদন্তিকে


আজ তার জন্মদিন। তিনি শারীরিকভাবে নেই, কিন্তু তার কণ্ঠ, সংলাপ, অভিব্যক্তি ও অভিনীত চরিত্র এখনো বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।


১৯৪১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ২০২১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তার শিল্পীজীবনের ব্যাপ্তি তাকে সময়ের সীমানার বাইরে নিয়ে গেছে।


বাংলা চলচ্চিত্রে অনেক অভিনেতা এসেছেন, অনেকে জনপ্রিয় হয়েছেন, আবার সময়ের সঙ্গে হারিয়েও গেছেন। কিন্তু এটিএম শামসুজ্জামান তাদের মধ্যে ব্যতিক্রম। তিনি একই সঙ্গে ভয় দেখিয়েছেন, হাসিয়েছেন, কাঁদিয়েছেন এবং ভাবিয়েছেন। এটাই একজন সত্যিকারের অভিনেতার সার্থকতা।


আজ তার জন্মদিনে তাই শুধু একজন প্রয়াত শিল্পীকে স্মরণ নয়; স্মরণ করা হচ্ছে বাংলা অভিনয়জগতের এমন এক অধ্যায়কে, যার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের চলচ্চিত্রের ইতিহাস।


এটিএম শামসুজ্জামান নেই, কিন্তু তার অভিনয়ের আলো এখনো নিভে যায়নি। পর্দায় তার প্রতিটি চরিত্র যেন বলে যায় শিল্পী চলে যান, শিল্প থেকে যায়।