
বাংলা অভিনয়জগতে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাদের নামের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট অভিনয়ভঙ্গি, সংলাপ বলার ধরন কিংবা চরিত্রের নিজস্ব রং জড়িয়ে যায়। মোশাররফ করিম তেমনই একজন। দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি যেমন হাসিয়েছেন, তেমনি কাঁদিয়েছেন; কখনো সাধারণ মানুষের চরিত্রে, কখনো অদ্ভুত রসবোধের চরিত্রে, আবার কখনো গভীর জীবনবোধসম্পন্ন মানুষের ভূমিকায় দর্শকের সামনে হাজির হয়েছেন। চরিত্রকে নিজের মতো করে নেওয়ার পাশাপাশি নিজের অভিনয় দিয়ে চরিত্রকেও আলাদা পরিচয় দিয়েছেন তিনি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নাটকের পাশাপাশি ওয়েব ফিল্ম, ওয়েব সিরিজ ও চলচ্চিত্রে তার উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৬ সালে ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’ ওয়েব ফিল্মের জন্য বাইফা পুরস্কারে জুরি বিভাগে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। একই বছর ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছেন।
মঞ্চ থেকে টেলিভিশনে
মোশাররফ করিমের অভিনয়জীবনের শিকড় থিয়েটারে। ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। পরে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয়ের ভিত তৈরি করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি নাট্যকেন্দ্রে যোগ দেন বলে বাংলা মুভি ডেটাবেজের তথ্য থেকে জানা যায়। দীর্ঘ সময় মঞ্চে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার অভিনয়ে যে গভীরতা তৈরি করেছে, তা পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে।
টেলিভিশনে তার পথচলার শুরুর দিকের কাজগুলোর মধ্যে ‘অতিথি’ উল্লেখযোগ্য। তবে ২০০৪ সালের দিকে ‘ক্যারাম’ নাটকে অভিনয় করার পর তার পরিচিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই নাটককে তার ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি নিজেও।
‘ক্যারাম’-এর পর মোশাররফ করিমকে আর শুধু একজন সাধারণ নাট্যাভিনেতা হিসেবে দেখা হয়নি। চরিত্রের ভেতরের মানুষটিকে পর্দায় তুলে ধরার ক্ষমতা তাকে দর্শকের কাছে আলাদা করে তোলে। তার অভিনয়ে যেমন স্বতঃস্ফূর্ততা আছে, তেমনি আছে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ।
হাসির আড়ালে গভীর জীবন
মোশাররফ করিমের জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ তার কৌতুকাভিনয়। কিন্তু তাকে শুধু কৌতুক অভিনেতা হিসেবে দেখলে তার অভিনয়জীবনের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়।
তার অভিনয়ের বিশেষত্ব হলো, হাসির দৃশ্যেও তিনি চরিত্রের বাস্তবতাকে ধরে রাখতে পারেন। ফলে তার সংলাপ শুধু হাসির জন্ম দেয় না, অনেক সময় চরিত্রটির অসহায়ত্ব, স্বপ্ন, ব্যর্থতা কিংবা সামাজিক অবস্থানকেও সামনে নিয়ে আসে।
একইভাবে গম্ভীর চরিত্রেও তিনি অতিরিক্ত নাটকীয়তার আশ্রয় নেন না। সংলাপ, অভিব্যক্তি, শরীরী ভাষা ও বিরতির মধ্য দিয়ে চরিত্রকে এগিয়ে নেন। এই সংযত অভিনয়ই তাকে দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের আগ্রহের কেন্দ্রে রেখেছে।
নামের পেছনেও রয়েছে গল্প
মোশাররফ করিম নামটির পেছনেও রয়েছে পারিবারিক স্মৃতি। তার আসল নাম ছিল মোশাররফ হোসেন। পরে বাবার নামের একটি অংশ নিজের নামের সঙ্গে যুক্ত করে ‘মোশাররফ করিম’ নামটি গ্রহণ করেন। অভিনয়জগতে এই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন।
নামের এই পরিবর্তনের সঙ্গে তার অভিনয়জীবনের পরিবর্তনের সময়টিও প্রায় একই পর্বে পড়ে। থিয়েটারের অভিজ্ঞতা থেকে টেলিভিশনের নিয়মিত কাজ, এরপর চলচ্চিত্র এবং ওটিটিতে বিস্তৃত উপস্থিতি, তার ক্যারিয়ারের প্রতিটি ধাপ যেন নতুন একটি অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
চলচ্চিত্রে বেছে বেছে কাজ
মোশাররফ করিম চলচ্চিত্রে নিয়মিতভাবে বিপুলসংখ্যক কাজ করেননি। বরং চরিত্র ও গল্পের গুরুত্বকে সামনে রেখে কাজ করার প্রবণতা তার ক্যারিয়ারে দেখা যায়। ‘দারুচিনি দ্বীপ’ দিয়ে বড় পর্দায় তার অভিষেক। এরপর ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’, ‘টেলিভিশন’, ‘জালালের গল্প’, ‘অজ্ঞাতনামা’, ‘হালদা’, ‘কমলা রকেট’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি।
এসব ছবিতে চরিত্রের ধরন এক নয়। কোথাও তিনি সামাজিক বাস্তবতার চরিত্রে, কোথাও গল্পের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক চরিত্রে, আবার কোথাও কেন্দ্রীয় চরিত্রের অংশ হিসেবে হাজির হয়েছেন। ফলে বড় পর্দায় তার কাজের পরিমাণের চেয়ে চরিত্রের বৈচিত্র্য বেশি আলোচিত হয়েছে।
ওটিটিতে নতুন মোশাররফ
বাংলাদেশের ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর বিস্তারের সঙ্গে অভিনেতাদের সামনে চরিত্র নির্বাচনের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। মোশাররফ করিমও সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন।
‘মহানগর’, ‘তিন শরতের গল্প’, ‘চক্কর ৩০২’, ‘ইনসাফ’, ‘অন্ধকারের গান’, ‘ডিমলাইট’সহ বিভিন্ন ওয়েব কনটেন্টে তাকে দেখা গেছে।
ওটিটির গল্পে চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ও সামাজিক বাস্তবতা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃতভাবে তুলে ধরার সুযোগ থাকে। মোশাররফ করিমের অভিনয়ের অন্যতম শক্তি এখানেই। তিনি চরিত্রকে শুধু সংলাপের মাধ্যমে প্রকাশ করেন না; বরং চরিত্রের আচরণ, দ্বিধা, নীরবতা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে তার প্রতিক্রিয়াকেও অভিনয়ের অংশ করে তোলেন।
২০২৬ সালে ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’ দিয়ে ওটিটিতে তার অভিনয় নতুন করে আলোচনায় আসে। বাইফা পুরস্কারে জুরি বিভাগে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতিও পান তিনি।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ ও নতুন অধ্যায়
চলতি সময়ের আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম। ২০২৬ সালের এ চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, দর্শক মৌলিক গল্প পছন্দ করেন এবং নিজেদের গল্পের মধ্যে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখতে চান।
এই বক্তব্য তার নিজের কাজের দর্শনের সঙ্গেও অনেকটা মিলে যায়। দীর্ঘদিনের অভিনয়জীবনে তিনি এমন চরিত্রে কাজ করেছেন, যেগুলোর সঙ্গে সাধারণ দর্শক নিজেদের জীবন, চারপাশের মানুষ কিংবা পরিচিত সামাজিক বাস্তবতার মিল খুঁজে পান।
‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর সাফল্যের কৃতিত্বও তিনি এককভাবে নিজের দিকে নেননি। তার মতে, একটি ভালো কাজের পেছনে পুরো দলের অবদান থাকে। এই দৃষ্টিভঙ্গিও তার দীর্ঘ অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
পুরস্কারের চেয়ে দর্শকের ভালোবাসা
অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে মোশাররফ করিম বিভিন্ন পুরস্কার পেয়েছেন। তবে তার জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পুরস্কারের সংখ্যা নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের আগ্রহ ধরে রাখা।
২০২১ সালে ‘মহানগর’-এর জন্য ব্লেন্ডারস চয়েস-দ্য ডেইলি স্টার ওটিটি অ্যান্ড ডিজিটাল কনটেন্ট অ্যাওয়ার্ডসে সমালোচক বিভাগে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পান তিনি। ২০২৬ সালে ‘বোহেমিয়ান ঘোড়া’র জন্য বাইফায় জুরি বিভাগে সেরা অভিনেতা হন।
তার কাছে অবশ্য সহশিল্পী ও দর্শকের প্রশংসাও বড় প্রাপ্তি। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, একজন সিনিয়র সহশিল্পীর কাছ থেকে ছবিটি দেখে প্রশংসা পাওয়াকে তিনি পুরস্কারের মতো মনে করেছেন।
কেন আলাদা মোশাররফ করিম
মোশাররফ করিমের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো বৈচিত্র্য। একই অভিনেতাকে একদিকে যেমন দর্শক হাসির চরিত্রে গ্রহণ করেছেন, অন্যদিকে তেমনি সিরিয়াস, জটিল কিংবা অন্ধকার চরিত্রেও বিশ্বাস করেছেন।
তিনি চরিত্রকে কৃত্রিমভাবে বড় করে তোলার বদলে চরিত্রের স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে অভিনয় খুঁজে নেন। তার সংলাপ বলার ধরন অনেক সময় সাধারণ মনে হলেও সেই সাধারণত্বের মধ্যেই থাকে চরিত্রের গভীরতা।
আর এ কারণেই দীর্ঘ অভিনয়জীবনের পরও তাকে ঘিরে দর্শকের আগ্রহ কমেনি। নতুন নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা ওয়েব কনটেন্টে তার নাম যুক্ত হলে আলাদা করে আলোচনা তৈরি হয়।
মঞ্চ থেকে টেলিভিশন, টেলিভিশন থেকে চলচ্চিত্র, আর চলচ্চিত্র থেকে ওটিটি, প্রতিটি মাধ্যমে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন মোশাররফ করিম। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই, তিনি একটি নির্দিষ্ট ছকে নিজেকে আটকে রাখেননি।
অভিনয় তার কাছে শুধু পেশা নয়, দীর্ঘদিনের চর্চা ও অনুসন্ধানের জায়গা। তাই সময়ের সঙ্গে বদলেছে তার চরিত্র, বদলেছে মাধ্যম, বদলেছে দর্শকের রুচি; কিন্তু অভিনয়ের প্রতি তার আগ্রহ ও দর্শকের সঙ্গে তার সংযোগ অটুট রয়েছে।
বাংলাদেশের অভিনয়জগতে মোশাররফ করিমের পথচলা তাই শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার গল্প নয়; এটি একজন শিল্পীর ক্রমাগত নিজেকে ভাঙা, নতুন চরিত্রে নিজেকে খুঁজে নেওয়া এবং দর্শকের সামনে বারবার নতুনভাবে ফিরে আসার গল্প।