News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
আতাউর রহমান সম্পাদক, দৈনিক বঙ্গলোক প্রবাস বাংলা 2026-09-10, 7:00pm

সিডনি অপেরা হাউস: আমার চোখে এক অমর কীর্তি ও ঐতিহ্যের মহাকাব্য

sydney-opera-house-017b85c6be511e4fe4502ab651bb53321789045239.jpg

সিডনি অপেরা হাউস। ছবি: সংগৃহীত


পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবনে দেশ-বিদেশের বহু স্থাপত্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং সংস্কৃতির মিলনমেলা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। সাংবাদিকতার তাগিদে এবং ব্যক্তিগত অন্বেষণে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরেছি। তবে অস্ট্রেলিয়ার বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা সিডনি অপেরা হাউস-এর মতো আর কোনো সৃষ্টি আমাকে এতটা গভীরভাবে আলোড়িত করতে পারেনি। 


কাজের সূত্রে এবং ভ্রমণের টানে এই সিডনি বন্দরে আমি কয়েক বার এসেছি। প্রতিবারই যখন বেনেলং পয়েন্টে দাঁড়িয়ে এই মহিমান্বিত স্থাপত্যের দিকে তাকিয়েছি, ততবারই একে নতুন মনে হয়েছে। এটি কেবল কংক্রিটের এক অনন্য কাঠামো নয়; বরং মানুষের অদম্য স্বপ্ন, সাধনা এবং সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল।


এই অপেরা হাউসের ইতিহাস এক চরম নাটকীয়তা ও দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে সিডনিতে একটি বড় পারফর্মিং আর্টস সেন্টার তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। 


১৯৫৫ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রিমিয়ার জোসেফ কাহিল একটি আন্তর্জাতিক নকশা প্রতিযোগিতার ডাক দেন। বিশ্বজুড়ে ২২৩টি নকশার মধ্য থেকে বেছে নেওয়া হয় ডেনমার্কের দূরদর্শী স্থপতি জর্ন উটজনের (Jorn Utzon) সেই বিখ্যাত ‘ভাসমান পাল’-এর মতো দেখতে অতুলনীয় নকশাটি। 


১৯৫৯ সালের ২ মার্চ সিডনি অপেরা হাউসের নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তবে এই পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। উটজনের জটিল জ্যামিতিক নকশা বাস্তবায়ন করা তৎকালীন প্রকৌশলীদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ছিল। বিশেষ করে এর বিখ্যাত ‘শেল’ বা খোলসগুলোর ভারসাম্য রক্ষা করা ছিল প্রায় অসম্ভব এক কাজ। বছরের পর বছর ধরে চলা বিতর্ক, রাজনৈতিক চাপ এবং নির্মাণব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণে একপর্যায়ে স্থপতি উটজন চরম অভিমান নিয়ে ১৯৬৬ সালে এই প্রকল্প থেকে পদত্যাগ করেন এবং অস্ট্রেলিয়া ত্যাগ করেন। 


একজন সম্পাদক হিসেবে আমি যখন এই ইতিহাসের পাতা উল্টাই, তখন বুঝতে পারি যেকোনো মহান সৃষ্টির পেছনে কতখানি ত্যাগ লুকিয়ে থাকে। পরবর্তীতে পিটার হলসহ অন্যান্য অস্ট্রেলীয় স্থপতিদের প্রচেষ্টায় উটজনের মূল নকশাকে অক্ষুণ্ণ রেখে কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।


অবশেষে সব বাধা পেরিয়ে, দীর্ঘ ১৪ বছর পর ১৯৭৩ সালের ২০ অক্টোবর রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের উদ্বোধনের মাধ্যমে এর নির্মাণযজ্ঞের সমাপ্তি ঘটে। কয়েক বারের ভ্রমণে আমি এই স্থাপত্যের ভেতরের বৈচিত্র্য ও কার্যকারিতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। এর ভেতরে রয়েছে একাধিক বিশ্বমানের পারফর্মিং হল। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো কনসার্ট হল (Concert Hall), যেখানে প্রায় ২,৬৭৯ জন দর্শক একসাথে বসতে পারেন। 


এই হলের মূল আকর্ষণ হলো এর বিশাল গ্র্যান্ড অর্গান, যা পৃথিবীর বৃহত্তম যান্ত্রিক ট্র্যাকার-অ্যাকশন অর্গান। এর পরেই রয়েছে জোয়ান সাদারল্যান্ড থিয়েটার (Joan Sutherland Theatre), যা অপেরা এবং ব্যালে নাচের জন্য বিখ্যাত। এছাড়া নাটক ও সমসাময়িক পরিবেশনার জন্য রয়েছে ড্রামা থিয়েটার (Drama Theatre) এবং প্লেহাউস (Playhouse)। 


আধুনিক সংস্কৃতির চর্চাকে আরও প্রাণবন্ত করতে এখানে যুক্ত হয়েছে মাল্টি-ইউজ স্পেস ‘দ্য স্টুডিও’ (The Studio)। প্রতিটি হলের নিখুঁত শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Acoustics) যেকোনো দর্শক ও শ্রোতাকে এক অপার্থিব অনুভূতি দেয়।শুধু সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই নয়, প্রতিদিন এই প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে হাজারো মানুষের পদচারণায়। দৈনিক গড়ে ৩০,০০০-এরও বেশি দর্শনার্থী এবং পর্যটক এই স্থাপত্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। 


অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর এখানে ১ কোটি ৯ লাখের বেশি মানুষের সমাগম ঘটে। এদের মধ্যে অনেকে আসেন গাইডেড ট্যুরে ভেতরের ইতিহাস জানতে, আবার কেউ আসেন এর ওপেন-এয়ার রেস্তোরাঁ ও বারে বসে সিডনি বন্দরের নয়নকাড়া দৃশ্য উপভোগ করতে। পর্যটকদের এই বিপুল আগ্রহ প্রমাণ করে যে, এই স্থাপত্য কেবল স্থানীয় নয়, বরং বৈশ্বিক সংস্কৃতির এক অপরিহার্য অংশ।


২০০৭ সালে এটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়, যা এর স্থাপত্যশৈলী ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে বিশ্বমঞ্চে অমর করে রেখেছে। দৈনিক বঙ্গলোক পত্রিকার সম্পাদকীয় টেবিলে বসে আমি যখনই সংস্কৃতির বিকাশ নিয়ে ভাবি, সিডনি অপেরা হাউসের ছবি আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। ১০ লাখেরও বেশি চকমকে সাদা টাইলস দিয়ে ঘেরা এর একেকটি খোলস যেন প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে ডানা মেলে থাকা কোনো শ্বেতশুভ্র গাঙচিল। 


অতীত ও বর্তমানের এই যে মেলবন্ধন, ইতিহাসের এই যে গৌরবময় ঐতিহ্য তা-ই সিডনি অপেরা হাউসকে আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় এবং অনুপ্রেরণাদায়ী স্থাপত্যে পরিণত করেছে। এটি শুধু সিডনির নয়, গোটা মানব সভ্যতার এক পরম গৌরব।