News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
আতাউর রহমান, সাংবাদিক, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, সিডনি প্রবাস বাংলা 2026-09-16, 9:22am

বিদায় প্রবীণ সাংবাদিক আমীরুল মোমেনীন: এক বস্তুনিষ্ঠ ও মানবিক অভিভাবকত্বের অবসান

86967-e80b9600fa91e6a2d74c0112b0c5acec1789529238.jpg


সময়টা ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩টা। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে যেন থমকে গেল বাংলাদেশের সাংবাদিকতার একটি সোনালি অধ্যায়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর গ্রিন রোডের নিজ বাসভবনে না ফেরার দেশে চলে গেলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় মানুষ, প্রবীণ সাংবাদিক আমীরুল মোমেনীন ভাই।

আজ আমি সুদূর প্রবাসে, মায়াময় কর্মজীবন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সিডনির মাটিতে বসে যখন তাঁর মৃত্যুর খবরটি শুনলাম, মনের কোণে জমে থাকা চার দশকেরও বেশি সময়ের স্মৃতিগুলো একের পর এক চোখের সামনে ভেসে উঠল। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে আজ লিখতে বসেছি তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন, অবদান এবং আমাদের সেই আত্মিক, গভীর ও নিবিড় বন্ধুত্বের কথা।

আমীরুল মোমেনীন ভাইয়ের কর্মজীবন আমাদের সবারই জানা। দৈনিক খবর থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রধান বার্তা সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে তাঁর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা আমাদের মুগ্ধ করেছে। বাসসে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, নির্ভরযোগ্য ও দায়িত্বশীল একজন মানুষ।

তাঁর সবচেয়ে বড় গুণগুলোর একটি ছিল জুনিয়রদের আগলে রাখা। সংবাদকক্ষে জুনিয়রদের কাজে কোনো ভুলত্রুটি হলে তিনি রেগে না গিয়ে পরম স্নেহে তা বুঝিয়ে দিতেন। প্রয়োজন হলে নিজের কাঁধে দায়িত্ব নিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সংবাদ পরিবেশন করতেন। তাঁর এই অভিভাবকসুলভ আচরণ জুনিয়রদের কাজ শেখার পথকে যেমন মসৃণ করেছিল, তেমনি সংবাদকক্ষে তৈরি করেছিল আস্থা ও নির্ভরতার পরিবেশ।

আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সখ্য আরও গভীর হয়েছিল মূলত কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিভিত্তিক তৎকালীন জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক কিষাণে কাজ করার সুবাদে। তৃণমূলের মানুষের প্রতি তাঁর যে দরদ আমি দেখেছি, তা সত্যিই বিরল। সাধারণ মানুষের জীবন, তাদের সুখ-দুঃখ ও প্রত্যাশার প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমত্ববোধ।

জাতীয় প্রেসক্লাবের দিনগুলোর কথাও আজ প্রবাসে বসে খুব মনে পড়ছে। দিনের পর দিন আমরা একসঙ্গে প্রেসক্লাবের মসজিদে নামাজ আদায় করেছি। নামাজ শেষে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা হতো। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার অত্যন্ত দায়িত্বশীল পদে থেকেও তাঁর মধ্যে কখনো অহংকার দেখিনি। বরং তরুণদের একজন মেন্টর হিসেবে সংবাদকক্ষে নৈতিকতা, বস্তুনিষ্ঠতা ও নির্ভুল তথ্য পরিবেশনের যে শিক্ষা তিনি দিতেন, তা আজও অনুকরণীয়।

আমাদের সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ছিল গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। সেই নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহে মাঠে ছিলেন আমীরুল মোমেনীন ভাই, আমি এবং আমাদের আরেক প্রিয় ব্যক্তিত্ব, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বাসসের সাবেক প্রধান আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া।

একটি বড় নির্বাচনের দ্রুত পরিবর্তনশীল ও সংবেদনশীল খবরগুলো বাসসের মাধ্যমে সারা দেশে নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়া ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মোমেনীন ভাইয়ের ঠান্ডা মাথার সিদ্ধান্ত, পেশাদারিত্ব এবং মাঠপর্যায়ের কাজের তদারকি আমাদের দায়িত্ব পালনের পথ অনেক সহজ করে দিয়েছিল। কাজের ফাঁকে ফাঁকে আমাদের আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা আর হাসিমুখের সেই দিনগুলো আজ শুধুই স্মৃতি।

পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও সহকর্মী হিসেবে সামাজিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অনন্য। সহকর্মীদের যেকোনো আপদ-বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে ভূমিকা রাখা এবং সামাজিক কল্যাণে তিনি নীরবে কাজ করে গেছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাবের অংশ।

দীর্ঘ জীবন চলার পথে মানুষ হিসেবে অজান্তে কিছু ভুলত্রুটি হয়ে যেতেই পারে। তাঁর একজন ঘনিষ্ঠ সহকর্মী হিসেবে সবার কাছে আমার আকুল অনুরোধ তিনি যদি কখনো কাউকে কোনোভাবে কষ্ট দিয়ে থাকেন কিংবা কোনো ভুল করে থাকেন, দয়া করে তাঁকে মন থেকে ক্ষমা করে দেবেন।

মোমেনীন ভাই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর কর্ম, সততা, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, মানবিকতা এবং স্নেহময় অভিভাবকত্ব রয়ে গেছে আমাদের মাঝে। তাঁর কাছ থেকে যারা সাংবাদিকতার পাঠ নিয়েছেন, যারা তাঁর সহকর্মী ছিলেন এবং যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের স্মৃতিতে তিনি দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবেন।

সবার কাছে দোয়া চাই আল্লাহ যেন এই সাদা মনের মানুষটিকে জান্নাতবাসী করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই অপূরণীয় ক্ষতি সহ্য করার শক্তি দান করেন।

বিদায় মোমেনীন ভাই।

আপনি আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন আজীবন।