
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের জীবনে নেমে এসেছে এক অভূতপূর্ব ও নজিরবিহীন বিপর্যয়।
দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ঘটা এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে মাঠপর্যায়ের সাধারণ মানুষদের। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ধারাবাহিক আক্রমণ, সামাজিক বর্জন এবং গণমামলার ফাঁদে পড়ে দলটির বিশাল এক সমর্থক গোষ্ঠী আজ চরম সংকটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে।
রাজনৈতিক দলটির এক পরিসংখ্যান ও স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় দুই কোটি আওয়ামী লীগের সমর্থক ও নেতাকর্মীর বাড়িঘর লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক মানুষের জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এবং সমসাময়িক পরিস্থিতি দলটির সাধারণ কর্মী ও সমর্থক পরিবারগুলোর মৌলিক নিরাপত্তা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছে।
এর পাশাপাশি সম্প্রতি এক ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে দলের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অভিযোগ করেছেন যে, গত দুই বছরে দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের প্রায় দশ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।পেশাজীবী ও প্রগতিশীল সমাজও লক্ষ্যবস্তুসবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এই সংকটের আঁচ কেবল সরাসরি politics করা নেতাকর্মীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এরমধ্যে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীল আদর্শ লালনকারী বিভিন্ন পেশাজীবীরাও রয়েছেন।
বহু বছর ধরে যারা নিজেদের পেশাগত জায়গা থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার পক্ষে কথা বলেছেন, তারাও এখন ঢালাও মামলার শিকার হচ্ছেন। অনেক শিক্ষককে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো হয়েছে, সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে এবং আইনজীবীরাও আদালতে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। ফলে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও প্রগতিশীল সমাজ আজ এক গভীর ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সিডনি থেকে আওয়ামী লীগ কর্মীর আকুতি:
মিরপুরে বাড়ি ভাঙচুর ও প্রাণনাশের হুমকিতৃণমূলের এই চরম সংকটের বাস্তব ও নির্মম চিত্র ফুটে উঠেছে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থানরত ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগ কর্মী তালুকদার আব্দুস সালামের বক্তব্যে।
দূর প্রবাসে থেকেও এক গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি জানান, "আওয়ামী লীগের সমর্থক ও কর্মী হিসেবে আমার স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় থাকায় ঢাকার মিরপুরে আমার স্থায়ী বাসভবনে ভয়াবহ হামলা, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। ঘরে থাকা মূল্যবান সামগ্রী লুটে নেওয়ার পর বাড়িটি সম্পূর্ণ বসবাসের অযোগ্য করে দেওয়া হয়েছে।
শুধু তাই নয়, সম্পূর্ণ মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একাধিক মামলা দিয়ে আমাকে ক্রমাগত হয়রানি করা হচ্ছে। এমনকি আমি বা আমার পরিবারের সদস্যরা দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন উপায়ে অনবরত হুমকি দেওয়া হচ্ছে।"
তার মতো এমন অসংখ্য কর্মী আজ জীবন ও পরিবারের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়েছেন এবং বিদেশে মানবিক সুরক্ষার আবেদন জানাচ্ছেন।পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও চরম মানবেতর জীবন-যাপন এই পরিস্থিতির সবচেয়ে করুণ প্রভাব পড়েছে পারিবারিক কাঠামোর ওপর। পুরুষ সদস্যরা গ্রেফতারের আতঙ্কে এলাকাছাড়া হওয়ায় এবং বসতভিটা আক্রান্ত হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা আজকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে চরম মানবেতর জীবন-যাপন করছেন।
সন্তানরা নিয়মিত পড়াশোনা করতে পারছে না, বৃদ্ধ মা-বাবা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং অনেক পরিবার এক বেলা খাবারের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। স্বজনদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে এই পরিবারগুলো এক চরম মানসিক ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে।তৃণমূলের জীবনে চরম বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বদলের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশই এখন কারাগারে অথবা নির্বাসনে থাকলেও, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মাশুল দিতে হচ্ছে তৃণমূলের সাধারণ কর্মী ও সমর্থকদের।
দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, অসংখ্য আওয়ামী লীগ কর্মীর ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও ব্যবসপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের আক্রমণ এবং উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ভীতি প্রদর্শনের কারণে বহু পরিবার নিজেদের পৈতৃক ভিটা ও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে অন্য কোথাও আত্মগোপন করতে বাধ্য হয়েছে।
জীবিকার স্বাভাবিক উৎস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক অনটনে মানবেতর জীবনযাপন করছে।গণমামলার ফাঁদ ও আইনি জটিলতাপরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও প্রগতিশীল পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে হাজার হাজার ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের একটি বড় অংশ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই মামলাগুলোর অনেকটিতেই সুনির্দিষ্ট তথ্যের চেয়ে ঢালাওভাবে কয়েকশ করে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হচ্ছে। সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী ও সমর্থকদের গুরুতর ফৌজদারি ধারায় মামলার আসামি করা হচ্ছে।
গ্রেফতারের আতঙ্ক এবং আইনি লড়াইয়ের আকাশচুম্বী খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো সামাজিকভাবে ও মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।মানবিক সংকট নিরসনের আহ্বানপরিস্থিতি থেকে বাঁচতে এবং আইনি হয়রানি এড়াতে দলটির অনেক নেতাকর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন বা বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টা করছেন। তবে যারা দেশে রয়ে গেছেন, তাদের বড় অংশই এখন মৌলিক অধিকার ও মানবিক সুরক্ষাহীনতায় ভুগছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতাদর্শের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু তার কারণে নাগরিকদের জীবন ধারণের অধিকার বিপন্ন হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
দেশের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা এবং প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হলে প্রতিটি নাগরিকের আইনি ও মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান ঘটানো জরুরি।