News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক প্রথম পাতা 2026-09-19, 7:37am

৪০০ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ে পাঠ্যবই, নিম্নমানের বই ধরা পড়ছে ছাপাখানায়

৫২ ছাপাখানায় কেটে ফেলা হয়েছে ১ কোটির বেশি ফর্মা, মান নিয়ে কঠোর নজরদারি এনসিটিবির

book-821f03288846297c2cf43c34766a38f71789781869.jpg

ছবি: সংগৃহীত


২০২৭ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা মূল্যের নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। তবে বই ছাপানোর কাজ শুরু হতে না হতেই বিভিন্ন ছাপাখানায় নিম্নমানের কাগজ, কালি ও মুদ্রণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। ইতোমধ্যে ৫২টি ছাপাখানায় মানহীন হিসেবে শনাক্ত হওয়া ১ কোটির বেশি ফর্মা কেটে নষ্ট করা হয়েছে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য এবার মোট ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হবে। এসব বই মুদ্রণে এনসিটিবি ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গতবারের তুলনায় এবার বই ছাপানোর ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এর সঙ্গে প্রাক্কলিত দরের তুলনায় ছাপাখানাগুলোর প্রায় ১০০ কোটি টাকা বেশি দর দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে সরকারের বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

ব্যয় বাড়লেও মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে কেন এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেশি মুনাফার আশায় কিছু প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত মানের কাগজ ও কালি ব্যবহার না করে কম দামের উপকরণ দিয়ে বই ছাপানোর চেষ্টা করছে। সরেজমিন পরিদর্শনে এমন বেশ কিছু অনিয়মের প্রমাণও মিলেছে।

কাগজ থেকে কালি-বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম

পাঠ্যবইয়ের মান যাচাইয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত মিনিস্ট্রি টিম, এনসিটিবির পরিদর্শন দল এবং ইন্সপেকশন এজেন্ট মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। তাদের পরিদর্শনে বইয়ের ফর্মা কম থাকা, একই ফর্মা একাধিকবার ছাপা, আলট্রা ভার্নিশ না করা, বাঁধাইয়ে ত্রুটি, নিম্নমানের কালি এবং কাটিংয়ে সমস্যা ধরা পড়েছে।

কিছু প্রতিষ্ঠানের ছাপানো বইয়ে বাইরে থেকে মান ভালো মনে হলেও ভেতরের পাতায় নিম্নমানের কাগজ ব্যবহারের অভিযোগও পাওয়া গেছে। কোথাও কাগজের মসৃণতা ঠিক নেই, কোথাও ছাপা ঝাপসা এবং কিছু ক্ষেত্রে কালি এক পাতার সঙ্গে অন্য পাতায় লেপ্টে যাওয়ার মতো ত্রুটি দেখা গেছে।

এসব ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ছাপাখানাগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। মানহীন বই শিক্ষার্থীদের হাতে যাতে না যায়, সে জন্য ত্রুটিপূর্ণ ফর্মা বাতিল করে নতুন করে বই ছাপানোর নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

মানচিত্রে ভুল রং, অস্পষ্ট লেখা

সম্প্রতি রাজধানীর মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন এবং অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং পরিদর্শন করে মিনিস্ট্রি টিম। সেখানে পঞ্চম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ে মানচিত্রের রঙে পরিবর্তন এবং মানচিত্রসংলগ্ন লেখায় অস্পষ্টতা পাওয়া যায়।

পরিদর্শনকারী দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ বইগুলো কেটে নষ্ট করা হয়। একই সময়ে ওই দুই ছাপাখানায় পাঠ্যবই ছাপার কাজে ব্যবহৃত নিম্নমানের কালি পাওয়া যায়। সেগুলোও সরিয়ে বিনষ্ট করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পরদিন এ ঘটনায় ছাপাখানা দুটির মালিক মিন্টু মোল্লাকে এনসিটিবিতে ডাকা হয়। সেখানে নিম্নমানের কালি ব্যবহারের বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম হবে না বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।

মিন্টু মোল্লা বলেন, অল্প কিছু বইয়ে সমস্যা হয়েছিল। সেগুলো আবার ছাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ত্রুটি

রেদওয়ানিয়া প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশনেও পরিদর্শনের সময় নিম্নমানের বই শনাক্ত হয়। পরে সেগুলো বাতিল করে কেটে ফেলা হয়েছে।

লেটার অ্যান্ড কালার নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি ‘এসো লিখতে শিখি’ খাতা ছাপার ক্ষেত্রেও মান নিয়ে আপত্তি ওঠে। সংশ্লিষ্ট বই ও খাতা বাতিল করা হয়েছে।

ফরাজি প্রেসে পরিদর্শনের সময়ও নিম্নমানের পাঠ্যবই পাওয়া যায়। সেগুলো বাতিল করার প্রক্রিয়ায় ছাপাখানাটির এক মালিক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে পরিদর্শন দলের সদস্যরা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

এনসিটিবির সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠান নয়, বেশির ভাগ ছাপাখানাতেই কোনো না কোনো ধরনের ত্রুটি পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ফর্মা, কাগজ, কালি, বাঁধাই ও কাটিংয়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান পুরোপুরি অনুসরণ করা হচ্ছে না।

কম দামের কাগজে নজর

পাঠ্যবইয়ের কাগজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নির্ধারিত বড় কাগজকলের পরিবর্তে অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম দামে ছোট কাগজকল থেকে কাগজ সংগ্রহ করছে। এতে কাগজের মান কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

নির্ধারিত মানের কাগজ ব্যবহার না করে খরচ কমানোর প্রবণতা থাকলে শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব বইয়ের স্থায়িত্ব ও পাঠযোগ্যতার ওপর পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

ইন্সপেকশন কর্মকর্তাকে হুমকির অভিযোগ

প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ের কাগজ ও মুদ্রণসামগ্রী পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি) নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সিরাজীম মুনিরকে নিম্নমানের কাগজ অনুমোদন না দেওয়ায় দুই সরবরাহকারী হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পাঠ্যবই ছাপানোর আগে কাগজের মান অনুমোদন নেওয়ার নিয়ম রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে কাগজ নির্ধারিত মান পূরণ করছে কি না, তা যাচাই করে ইন্সপেকশন এজেন্ট। পরীক্ষায় মান উত্তীর্ণ হওয়ার পরই কাগজ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়।

কারও কাজ কম, কারও দ্বিগুণ

পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ বণ্টন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, কাজ বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্যের কারণে অনেক ছাপাখানা তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ পাচ্ছে না। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নিজেদের সক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি কাজ পেয়েছে।

তার দাবি, এই পরিস্থিতির পেছনে সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে। পাঠ্যবই ছাপানোর কাজের বণ্টন আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

মান নিশ্চিতে কঠোর অবস্থান এনসিটিবির

এনসিটিবির কন্ট্রোলার মো. লুত্ফর রহমান বলেন, বইয়ের মান নিশ্চিত করতে সংস্থাটি এবার শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি করছে। পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি অনিয়মে জড়িত একটি ছাপাখানার মালিককে ডেকে সতর্ক করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের মান নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবির নির্দেশনায় ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডি আয়োজিত কর্মশালায় এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মো. আবু নাসের টুকু প্রধান অতিথি ছিলেন।

কর্মশালায় ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির স্বত্বাধিকারী শেখ বেলাল হোসাইন বলেন, পাঠ্যবইয়ের মানের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। পরীক্ষার মাধ্যমে কাগজের গুণমান নিশ্চিত করেই তা ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।

বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই পৌঁছে দেওয়া সরকারের অন্যতম বড় শিক্ষা কার্যক্রম। তাই বিপুলসংখ্যক বই নির্ধারিত সময়ে ছাপার পাশাপাশি প্রতিটি বইয়ের কাগজ, ছাপা, বাঁধাই ও সামগ্রিক মান নিশ্চিত করাই এখন এনসিটিবির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।