
কুমিল্লায় স্কুলছাত্র ইশিয়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) হত্যার ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে প্রথমে এক কিশোরকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজনকে আটক করা হয়। আটক এক কিশোরের বাড়ি থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করেছে পুলিশ।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার জুমার নামাজের পর পরিবারের সঙ্গে দুপুরের খাবার খায় অপ্রতিম। পরে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় সে। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বের হওয়ার পর আর বাড়ি ফেরেনি।
বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও অপ্রতিমের সন্ধান না পেয়ে তার বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
অপ্রতিম স্থানীয় বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর তার সন্ধানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ।
ফুটেজে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। এরপর তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করে শনিবার বিকেলে আটক করা হয়।
সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার পর ওই কিশোরকে আটক করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে।
শনিবার রাত ৮টার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় আটক কিশোরের বাড়িতে অভিযান চালায় জেলা পুলিশের একটি দল।
অভিযানে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়।
কুমিল্লা কোটবাড়ী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মফিজ উদ্দিন ভূইয়া বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ওই কিশোরকে আটক করা হয়েছিল। পরে তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের আইফোন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানায়, প্রথমে আটক কিশোরকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্ধ্যার পর আরও দুজনকে আটক করা হয়। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে।
এ ছাড়া সন্দেহভাজন আরও একজনকে এসআরবি হেফাজতে রাখা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের ডিবি ও এসআরবির হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি রকিবুল ইসলাম বলেন, তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
এর আগে শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের লালমাই সানন্দা পাহাড় এলাকার জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদনে মাথায় গুরুতর আঘাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়।
সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাথায় আঘাতের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও ছোটখাটো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে বলে জানান তিনি।
ময়নাতদন্তে অংশ নেওয়া একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে মাথায় আঘাতের কারণে অপ্রতিমের মৃত্যু হয়েছে।
তবে তাকে শ্বাসরোধ করা হয়েছিল কি না কিংবা হত্যার আগে কোনো চেতনানাশক দ্রব্য খাওয়ানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে শরীর থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, অপ্রতিমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে চাইছে না পুলিশ।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, ‘শুক্রবার জুমার নামাজের পর অপ্রতিম আমাদের সঙ্গে দুপুরের খাবার খায়। পরে বন্ধুদের সঙ্গে আইফোন দিয়ে ছবি তুলতে বাইরে যেতে চায়। কিন্তু আর ফিরে আসেনি।’
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘সম্ভবত আইফোনটিই তার মৃত্যুর কারণ হয়েছে।’
কুমিল্লা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহ বলেন, স্কুলছাত্র হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে এবং ঘটনায় জড়িতদের আটক করা হয়েছে।
তিনি জানান, রোববার পুলিশ সুপার সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন।
এ ঘটনায় রোববার অপ্রতিমের পরিবার মামলা করবে বলে জানিয়েছে।