News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক সাহিত্য ও সাময়িকী 2026-09-02, 9:05am

কালজয়ী লেখক হুমায়ূন আহমেদ

humayun-ahmed-14671e53336b7e15c1622a778878caa91788318322.jpg


বাংলা সাহিত্যের আকাশে তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর লেখায় ছিল মানুষের জীবনের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, স্বপ্ন-হতাশা আর নিঃসঙ্গতার গল্প। সহজ-সরল ভাষায় সাধারণ মানুষের মনের কথা তুলে ধরে যিনি কোটি পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন, তিনি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।


হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র জগতের স্রষ্টা। উপন্যাস, গল্প, নাটক, চলচ্চিত্র—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর সৃষ্টিশীলতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। তাঁর লেখার চরিত্রগুলো যেন আমাদের খুব পরিচিত মানুষ—কখনো পরিবারের কেউ, কখনো পাশের বাড়ির মানুষ, আবার কখনো নিজের মনেরই কোনো এক অচেনা সত্তা।


১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। পিতা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদ। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্য ও সৃজনশীলতার প্রতি তাঁর ঝোঁক ছিল।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে শিক্ষকতা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হলেও সাহিত্যই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তাঁর প্রধান পরিচয়। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ বাংলা সাহিত্যে নতুন এক সম্ভাবনার জানান দেয়। এরপর একের পর এক উপন্যাস, গল্প ও নাটক লিখে তিনি পাঠকের কাছে হয়ে ওঠেন অত্যন্ত জনপ্রিয়।


‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘দেবী’, ‘মিসির আলি’ ও ‘হিমু’সহ অসংখ্য সৃষ্টিতে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব একটি জগৎ তৈরি করেন। বিশেষ করে হিমু ও মিসির আলি চরিত্র বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় চরিত্রের তালিকায় আলাদা স্থান করে নিয়েছে।


হুমায়ূন আহমেদের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর ভাষা। কঠিন বিষয়কেও তিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীলভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পারতেন। তাঁর লেখায় ছিল রসবোধ, সূক্ষ্ম দর্শন, মানবিকতা এবং জীবনের গভীর পর্যবেক্ষণ। ফলে তাঁর বই হাতে নিলে পাঠক সহজেই গল্পের ভেতরে ঢুকে পড়তেন।


সাহিত্যের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকেও তিনি সৃষ্টি করেন নতুন এক যুগ। ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘অয়োময়’ ও ‘আজ রবিবার’-এর মতো নাটক দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তাঁর নির্মিত নাটকের চরিত্র ও সংলাপ মানুষের মুখে মুখে ফিরত।


চলচ্চিত্র নির্মাণেও তিনি নিজের স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় দেন। ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’ ও ‘আমার আছে জল’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর নির্মাণশৈলী দর্শক-সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ‘আগুনের পরশমণি’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন।


তাঁর সাহিত্যজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল পাঠকের সঙ্গে গভীর সংযোগ। হুমায়ূন আহমেদের বই প্রকাশ মানেই ছিল পাঠকের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ। বইমেলায় তাঁর নতুন বই ঘিরে তৈরি হতো আলাদা উন্মাদনা। অসংখ্য তরুণ-তরুণী তাঁর লেখা পড়ে বাংলা সাহিত্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।


ব্যক্তিজীবনেও নানা ওঠাপড়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবে সৃষ্টিশীলতার জায়গায় তিনি কখনো থেমে থাকেননি। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত লিখে গেছেন, চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন এবং পাঠক-দর্শকদের জন্য রেখে গেছেন অসংখ্য অমর সৃষ্টি।


২০১২ সালের ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্য হারায় একজন অসাধারণ কথাশিল্পী। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি তাঁকে আজও পাঠকের কাছে জীবন্ত করে রেখেছে।


শারীরিকভাবে তিনি নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্ট হিমু, মিসির আলি, শুভ্র কিংবা বাকের ভাইয়ের মতো চরিত্রগুলো আজও মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে আছে। তাঁর উপন্যাসের পাতা উল্টালে আজও পাঠক খুঁজে পান পরিচিত কোনো অনুভূতি, কোনো অপ্রকাশিত কথা কিংবা নিজের জীবনের কোনো গল্প।


হুমায়ূন আহমেদ তাই কেবল একটি নাম নয়; তিনি বাংলা সাহিত্যের একটি যুগ। তাঁর সৃষ্টি যতদিন পাঠকের হাতে হাতে ফিরবে, যতদিন মানুষ তাঁর গল্প পড়ে হাসবে, কাঁদবে কিংবা ভাববে—ততদিন কালজয়ী লেখক হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই।