News update
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
  • হঠাৎ চলন্ত মেট্রোরেলের খুলে গেল দরজা     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক সাহিত্য ও সাময়িকী 2026-09-09, 12:34pm

ক্ষণজন্মা কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য: ক্ষুধার পৃথিবী থেকে মানুষের মুক্তির স্বপ্ন

sukanto-fba7e7e6a1e3e1cab7f16e777e2c3f8c1788935651.jpg


বাংলা কবিতার আকাশে অনেক নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটেছে। কেউ দীর্ঘ সাহিত্যজীবন পেরিয়ে হয়ে উঠেছেন কালজয়ী, কেউ আবার অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের স্বতন্ত্র কণ্ঠে নাড়া দিয়েছেন পাঠকের হৃদয়। সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁদের মধ্যে অনন্য। মাত্র ২১ বছরের জীবনে তিনি যে সাহিত্যভুবন নির্মাণ করে গেছেন, তা বাংলা কবিতায় আজও উজ্জ্বল। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, শোষণ, বৈষম্য, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ। একই সঙ্গে ছিল নতুন ও মানবিক পৃথিবী নির্মাণের প্রত্যয়।


১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতায় জন্ম নেওয়া সুকান্ত ভট্টাচার্য কৈশোরেই সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। অল্প বয়সেই কবিতা, ছড়া, গল্প ও বিভিন্ন ধরনের রচনা লিখে তিনি নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট তাঁর কবিমনে গভীর রেখাপাত করে। ফলে তাঁর কবিতা নিছক সৌন্দর্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; হয়ে উঠেছে সময় ও সমাজের প্রত্যক্ষ দলিল।


সুকান্ত ছিলেন মার্কসবাদী চেতনায় বিশ্বাসী কবি। তাঁর সাহিত্যচেতনার কেন্দ্রে ছিল শ্রমজীবী ও নিপীড়িত মানুষের জীবন। তিনি কবিতায় এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষ ক্ষুধা ও বঞ্চনা থেকে মুক্ত হবে। তাঁর কবিতায় তাই প্রেম ও প্রকৃতির পাশাপাশি এসেছে শ্রেণিবৈষম্য, শ্রম, সংগ্রাম ও বিপ্লবের কথা। তবে তাঁর কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।


বাংলা কবিতায় সুকান্তের আবির্ভাব এমন এক সময়ে, যখন সমাজজীবন ছিল চরম অস্থির। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলার লাখো মানুষ অনাহার ও রোগে মারা যায়। রাস্তায় পড়ে থাকা কঙ্কালসার মানুষের ছবি, খাদ্যের জন্য মানুষের হাহাকার এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য তরুণ কবির বিবেককে নাড়া দেয়। সেই বাস্তবতাই তাঁর কবিতায় রূপ পেয়েছে তীব্র প্রতিবাদী ভাষায়। তাঁর কাছে কবিতা ছিল মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো অলংকার নয়; বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার।


সুকান্তের সবচেয়ে আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘ছাড়পত্র’। গ্রন্থটি তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হলেও বাংলা রাজনৈতিক ও মানবিক কবিতার ইতিহাসে এটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে একদিকে রয়েছে ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তনাদ, অন্যদিকে রয়েছে ভবিষ্যতের প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়। নতুন শিশুর জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতার অন্যতম শক্তিশালী মানবিক প্রতীক।


‘ছাড়পত্র’-এর পাশাপাশি ‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’, ‘মিঠেকড়া’, ‘অভিযান’, ‘হরতাল’ ও ‘গীতিগুচ্ছ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা। এসব গ্রন্থে তাঁর সাহিত্যিক পরিসরের বৈচিত্র্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কবিতা, ছড়া, গল্প, গান ও অন্যান্য রচনায় তিনি নিজের সময়কে ধারণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরও একের পর এক রচনা প্রকাশিত হয়েছে এবং পাঠকের কাছে তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্ব ক্রমেই বেড়েছে।


সুকান্তের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর ভাষার সরলতা ও তীব্রতা। তিনি জটিল অলংকারের আড়ালে বক্তব্যকে লুকিয়ে রাখেননি। বরং সাধারণ মানুষের মুখের ভাষার কাছাকাছি গিয়ে তিনি কবিতা নির্মাণ করেছেন। তাঁর কবিতায় ক্ষুধা কখনো কেবল ব্যক্তিগত অভাব নয়; এটি হয়ে ওঠে একটি সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ। রুটি, ধান, শ্রম, ঘাম, কারখানা, কৃষক, মজুর এসব সাধারণ উপাদান তাঁর কবিতায় অসাধারণ তাৎপর্য লাভ করেছে।


তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘আঠারো বছর বয়স’ তরুণ প্রজন্মের সাহস, স্বপ্ন ও সংগ্রামের প্রতীক হয়ে আছে। বয়সের সীমাবদ্ধতার চেয়ে মানুষের সম্ভাবনাকে বড় করে দেখেছেন কবি। তরুণ বয়সকে তিনি দেখেছেন অন্যায় ও বাধার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি হিসেবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর কবিতা স্বাধীনতাকামী মানুষের মনে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল বলে বাংলা সাহিত্যচর্চায় উল্লেখ করা হয়।


তাঁর আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা। তিনি নিজের সময়ের সংকটকে শুধু তুলে ধরেননি; সেই সংকট অতিক্রম করে একটি নতুন পৃথিবী নির্মাণের স্বপ্নও দেখেছেন। তাঁর কবিতায় তাই হতাশার পাশাপাশি আছে প্রত্যয়, অন্ধকারের পাশাপাশি আছে আলোর আকাঙ্ক্ষা। এই দ্বৈততা তাঁর কবিতাকে শুধু রাজনৈতিক কবিতা না রেখে গভীর মানবিক কবিতায় পরিণত করেছে।


সুকান্ত কেবল কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সংগঠক ও সম্পাদকও। ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দুর্ভিক্ষের সময় মানুষের দুর্দশাকে সামনে রেখে তিনি ‘আকাল’ নামে একটি কাব্যসংকলন সম্পাদনা করেন। এতে তাঁর সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সমাজের প্রতি সক্রিয় দায়বদ্ধতার পরিচয় পাওয়া যায়।


তবে প্রতিভাবান এই কবির জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। স্বাধীনতার মাত্র কয়েক মাস আগে তাঁর এই অকালমৃত্যু বাংলা সাহিত্যকে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। তাঁর জীবনের বড় অংশই ছিল সংগ্রাম, অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটে ঘেরা। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় আরও বিস্তৃত হয়েছে।


সুকান্তের মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‘ছাড়পত্র’ তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে ‘ঘুম নেই’, ‘পূর্বাভাস’, ‘মিঠেকড়া’, ‘অভিযান’, ‘হরতাল’ ও ‘গীতিগুচ্ছ’সহ তাঁর বিভিন্ন রচনা পাঠকের সামনে আসে। তাঁর কবিতার সংকলন বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে এবং দুই বাংলাতেই তাঁর সাহিত্য পাঠকের কাছে সমাদৃত হয়েছে।


বাংলা সাহিত্যে সুকান্ত ভট্টাচার্যের অবস্থান তাই কেবল একজন তরুণ কবির পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ছিলেন ক্ষুধার্ত মানুষের কবি, শ্রমজীবী মানুষের কবি, প্রতিবাদের কবি এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীর স্বপ্নদ্রষ্টা। তাঁর কবিতায় যে ক্ষুধা, তা কেবল পেটের ক্ষুধা নয় তা ন্যায়, মর্যাদা ও মুক্তির ক্ষুধা। তাঁর স্বপ্নের পৃথিবী এমন এক পৃথিবী, যেখানে শিশুর মুখে হাসি থাকবে, মানুষ মানুষকে শোষণ করবে না এবং জীবনের মৌলিক অধিকার থেকে কেউ বঞ্চিত হবে না।


আজকের পৃথিবীতেও যখন যুদ্ধ, বৈষম্য, দারিদ্র্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে, তখন সুকান্তের কবিতা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে; কিন্তু ক্ষুধা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের যে দীর্ঘ সংগ্রাম, তা এখনো শেষ হয়নি। আর সেখানেই সুকান্তের কবিতা বারবার ফিরে আসে।


মাত্র ২১ বছরের জীবনে যে কবি বাংলা কবিতায় এত গভীর ছাপ রেখে গেছেন, তাঁর সাহিত্যকীর্তি প্রমাণ করে সাহিত্যে স্থায়ী হয়ে থাকার জন্য দীর্ঘ জীবন নয়, প্রয়োজন গভীর জীবনবোধ ও মানুষের প্রতি অকৃত্রিম দায়বদ্ধতা। সুকান্ত ভট্টাচার্য সেই বিরল প্রতিভা, যিনি স্বল্পায়ু জীবনের মধ্যেই সময়কে অতিক্রম করে গেছেন। তাঁর কবিতা আজও উচ্চারণ করে মানুষের মুক্তির কথা, নতুন দিনের কথা এবং একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর স্বপ্ন।


সুকান্ত তাই শুধু অতীতের কবি নন; তিনি প্রতিটি প্রজন্মের কবি। যত দিন পৃথিবীতে ক্ষুধা থাকবে, যত দিন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ দাঁড়াবে, যত দিন নতুন প্রজন্ম একটি সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখবে তত দিন সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা পাঠকের হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।