News update
  • ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২০০ ছাড়াল, ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ১৮৬৬     |     
  • স্থানীয় সরকার নির্বাচন আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু: মীর শাহে আলম     |     
  • বিশ্ববাজারে আরও কমলো জ্বালানি তেলের দাম     |     
  • পাসপোর্ট হারালে দ্বিতীয়বার থেকে জরিমানা ১০ হাজার টাকা     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক সাহিত্য ও সাময়িকী 2026-09-17, 11:39pm

কালজয়ী ঔপন্যাসিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

ch-d88fc6edf21ea464d35ff76288b841031789666743.jpg


বাংলা সাহিত্যের বিশাল ভুবনে এমন কিছু লেখক আছেন, যাঁদের সৃষ্টি শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ের পাঠকের কাছে জনপ্রিয় হয়ে থেমে থাকেনি; প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে তাঁদের লেখা মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁদেরই একজন। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি এমন এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন, দুঃখ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, সামাজিক সংকট, নারীর বঞ্চনা এবং মানুষের অন্তর্গত দ্বন্দ্ব অত্যন্ত সহজ অথচ গভীর ভাষায় উঠে এসেছে। তাঁর সাহিত্য পাঠককে শুধু গল্প শোনায় না, বরং সমাজ ও মানুষকে নতুন করে দেখতে শেখায়।

১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম। তাঁর পিতা মতিলাল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সাহিত্যপ্রবণ ও কল্পনাশীল মানুষ। পারিবারিক আর্থিক অনটনের কারণে শরৎচন্দ্রের শৈশব ও কৈশোর ছিল নানা প্রতিকূলতায় ভরা। তাঁর জীবনের বড় একটি সময় কেটেছে ভাগলপুরে। সেখানে বসবাসের অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ মানুষের খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ তাঁর সাহিত্যিক মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

প্রথাগত শিক্ষাজীবন খুব বেশি দূর এগোয়নি। কিন্তু বই পড়া, মানুষের জীবন পর্যবেক্ষণ এবং নিজের অভিজ্ঞতাকে সাহিত্যে রূপ দেওয়ার ক্ষমতা তাঁকে পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাশিল্পীতে পরিণত করে। জীবনের নানা বাঁক, অর্থনৈতিক সংকট এবং দীর্ঘ সময়ের প্রবাসজীবন তাঁর অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যজীবনের শুরুটা ছিল কিছুটা নীরব। তাঁর প্রথম দিকের লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রে নানা বাধা ছিল। কিন্তু ‘বড়দিদি’ প্রকাশের পর পাঠকমহলে তাঁর পরিচিতি তৈরি হতে শুরু করে। এরপর একের পর এক উপন্যাস ও গল্প প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ভাষার স্বাভাবিকতা। তিনি এমনভাবে লিখতেন, যেন পাঠকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন।

বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষা ও সাহিত্যিক উচ্চতার পাশাপাশি শরৎচন্দ্র গড়ে তুলেছিলেন সাধারণ মানুষের জীবনকেন্দ্রিক এক শক্তিশালী কথাসাহিত্য। তাঁর চরিত্রগুলো ছিল আমাদের খুব পরিচিত গ্রামের নারী, মধ্যবিত্ত যুবক, দরিদ্র পরিবার, সমাজের অবহেলিত মানুষ, প্রেমে ব্যর্থ মানুষ কিংবা সামাজিক বিধিনিষেধে আটকে থাকা নারী। ফলে তাঁর গল্পের মানুষগুলো পাঠকের কাছে কল্পিত চরিত্রের চেয়ে বাস্তব জীবনের মানুষ হিসেবেই বেশি মনে হয়।

নারীর জীবনের গভীর পাঠ

শরৎচন্দ্রের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে নারীর চরিত্রচিত্রণ বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। তাঁর সময়ের সমাজে নারীর জীবন ছিল নানা বিধিনিষেধ, সামাজিক অনুশাসন ও বৈষম্যে আবদ্ধ। শরৎচন্দ্র সেই বাস্তবতাকে অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে সাহিত্যে তুলে ধরেছেন।

‘দত্তা’র বিজয়া, ‘দেবদাস’-এর পার্বতী, ‘চরিত্রহীন’-এর কিরণময়ী, ‘গৃহদাহ’-এর অচলা কিংবা ‘বিরাজ বৌ’-এর বিরাজ প্রতিটি চরিত্রের জীবন আলাদা, কিন্তু তাদের মধ্যে রয়েছে আত্মমর্যাদা, অনুভূতি, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সংঘাত। শরৎচন্দ্র নারীদের শুধু প্রেমের চরিত্র হিসেবে দেখেননি; তাঁদের নিজস্ব চিন্তা, বেদনা, সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিসত্তাকেও গুরুত্ব দিয়েছেন।

তাঁর নারী চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো মানবিক গভীরতা। সমাজ যাঁদের অনেক সময় ‘ভুল’ বা ‘অপরাধী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, শরৎচন্দ্র তাঁদের জীবন ও পরিস্থিতিকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্য একদিকে সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধকে প্রশ্ন করেছে, অন্যদিকে মানুষের প্রতি সহমর্মিতার জায়গা তৈরি করেছে।

‘দেবদাস’ থেকে ‘শ্রীকান্ত’

শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে পরিচিত রচনাগুলোর একটি ‘দেবদাস’। প্রেম, সামাজিক বাধা, ব্যক্তিগত দুর্বলতা ও আত্মধ্বংসের করুণ কাহিনি এই উপন্যাসকে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত প্রেমকাহিনিতে পরিণত করেছে। দেবদাস-পার্বতীর সম্পর্ক শুধু একটি ব্যর্থ প্রেমের গল্প নয়; এর ভেতরে রয়েছে সামাজিক শ্রেণি, পারিবারিক অহংকার এবং ব্যক্তির সিদ্ধান্তহীনতার জটিলতা।

‘শ্রীকান্ত’ শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক প্রতিভার আরেকটি অনন্য নিদর্শন। ভ্রমণ, অভিজ্ঞতা, সম্পর্ক এবং জীবনের নানা মানুষের সঙ্গে পরিচয়ের মধ্য দিয়ে শ্রীকান্তের জীবন এগিয়ে যায়। উপন্যাসটির পরিসর বিশাল এবং চরিত্রগুলোও বহুমাত্রিক। রাজলক্ষ্মী, অভয়া কিংবা কমললতার মতো চরিত্র বাংলা কথাসাহিত্যে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে।

‘শ্রীকান্ত’-এ ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতা, প্রেম, সমাজের বিধিনিষেধ এবং জীবনের অনিশ্চয়তা একসঙ্গে ধরা পড়ে। তাই উপন্যাসটি শুধু একটি ব্যক্তির কাহিনি নয়; এটি একই সঙ্গে একটি সময়, সমাজ ও মানুষের মনোজগতের দলিল।

সমাজের প্রচলিত ধারণার বিরুদ্ধে

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান। বাল্যবিবাহ, নারীর প্রতি বৈষম্য, জাতপাত, সামাজিক ভণ্ডামি, কুসংস্কার এসব বিষয়ে তাঁর লেখায় বারবার প্রশ্ন উঠেছে।

‘পথের দাবী’ উপন্যাসে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তার একটি ভিন্ন দিক প্রকাশ পায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময় লেখা এই উপন্যাসে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও বিপ্লবী চেতনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রকাশের পর বইটি ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ করেছিল। এতে বোঝা যায়, শরৎচন্দ্র শুধু প্রেম ও পারিবারিক জীবনের গল্প লিখে জনপ্রিয় হননি; সময়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

তবে তাঁর সাহিত্যকে কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তাঁর সৃষ্টির বিশাল মানবিক পরিসর ধরা পড়ে না। তাঁর মূল শক্তি ছিল মানুষকে দেখা তার দুর্বলতা, ভালোবাসা, অপরাধবোধ, আকাঙ্ক্ষা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামসহ।

সহজ ভাষার অসাধারণ শক্তি

শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর ভাষা। তিনি দুর্বোধ্য শব্দের ভারে পাঠককে ক্লান্ত করেননি। কথ্যজীবনের কাছাকাছি সহজ, সাবলীল ও আবেগঘন ভাষায় তিনি গল্প বলেছেন। কিন্তু সরল ভাষা মানেই সরল সাহিত্য নয় এই সত্য শরৎচন্দ্রের রচনায় স্পষ্ট।

তাঁর বাক্য নির্মাণে নাটকীয়তা আছে, সংলাপে স্বাভাবিকতা আছে এবং চরিত্রের অনুভূতিতে গভীরতা আছে। ফলে তাঁর লেখা পড়তে গিয়ে পাঠক খুব সহজেই চরিত্রগুলোর জীবনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারেন।

এ কারণেই শরৎচন্দ্রের সাহিত্য শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পাঠকের পাশাপাশি সাধারণ পাঠকের কাছেও বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তাঁর বইয়ের পাঠকসংখ্যা শুধু শহরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; গ্রামবাংলার পাঠকরাও তাঁর রচনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়েছেন।

চলচ্চিত্রে শরৎচন্দ্র

শরৎচন্দ্রের সাহিত্য বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর বহু উপন্যাস ও গল্প নিয়ে বাংলা, হিন্দি এবং অন্যান্য ভারতীয় ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। বিশেষ করে ‘দেবদাস’ বহুবার চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে। উপন্যাসটির চরিত্র ও আবেগ বিভিন্ন সময়ের নির্মাতাদের নতুন করে আকৃষ্ট করেছে।

‘পরিণীতা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘চরিত্রহীন’, ‘দত্তা’, ‘শ্রীকান্ত’সহ আরও বেশ কিছু রচনা চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছেছে। এতে প্রমাণিত হয়, তাঁর গল্পের মূল মানবিক আবেদন সময় ও মাধ্যমের পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যায়নি।

কেন আজও প্রাসঙ্গিক শরৎচন্দ্র?

প্রশ্ন উঠতে পারে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে যে সমাজের কথা শরৎচন্দ্র লিখেছেন, সেই সাহিত্য আজও কেন পাঠককে টানে?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মৌলিক অনুভূতিতে। প্রেম, বিচ্ছেদ, অভিমান, সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক চাপ, আত্মসম্মান, একাকিত্ব, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন এসব অনুভূতি সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি বদলে যায় না। প্রযুক্তি বদলেছে, জীবনযাপন বদলেছে, সমাজের কাঠামোও অনেক পরিবর্তিত হয়েছে; কিন্তু মানুষের আবেগের মৌলিক জায়গাগুলো এখনো অনেকাংশে একই রয়ে গেছে।

আজকের পাঠক যখন পার্বতীর জীবনের দিকে তাকান, তখন শুধু পুরোনো সমাজের একটি মেয়েকে দেখেন না; তিনি নিজের সময়ের সম্পর্ক ও সামাজিক বাধার সঙ্গেও মিল খুঁজে পান। ‘শ্রীকান্ত’ পড়লে মানুষের স্বাধীনভাবে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা নতুন করে ধরা দেয়। ‘চরিত্রহীন’ পড়লে সমাজের তৈরি করা নৈতিকতার মানদণ্ড নিয়ে প্রশ্ন জাগে। আর ‘দেবদাস’ পড়লে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, সামাজিক বাস্তবতা ও সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে ভাবতে হয়।

পাঠকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক কৃতিত্ব শুধু তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তায় নয়। তাঁর প্রকৃত কৃতিত্ব হলো তিনি বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্রে সাধারণ মানুষকে নিয়ে এসেছেন। সমাজের প্রান্তে থাকা মানুষ, বিশেষ করে নারীর জীবন ও অনুভূতিকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা তাঁর সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মানবিক ও প্রশ্নমুখী ছিল।

১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক জীবন থেমে যায়নি। মৃত্যুর পরও তাঁর বই প্রকাশিত হয়েছে, পুনর্মুদ্রিত হয়েছে, বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে, নাটক ও চলচ্চিত্রে রূপ পেয়েছে। নতুন প্রজন্মের পাঠকও তাঁর চরিত্রগুলোর মধ্যে নিজেদের আবেগ ও জীবনের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান।

বাংলা সাহিত্যে অনেক লেখক এসেছেন, অনেকে যুগান্তকারী সৃষ্টি রেখে গেছেন। কিন্তু শরৎচন্দ্রের বিশেষত্ব হলো তাঁর কাছে পৌঁছাতে পাঠকের কোনো কঠিন দরজা পেরোতে হয় না। তাঁর ভাষা সহজ, গল্প পরিচিত, চরিত্র মানবিক আর সেই মানবিকতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে গভীর সাহিত্যিক শক্তি।

তাই শরৎচন্দ্র শুধু একটি সময়ের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নন; তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের এমন এক স্থায়ী নাম, যাঁর সৃষ্টির সঙ্গে বারবার ফিরে আসতে হয় মানুষ ও সমাজকে বোঝার জন্য। সময় বদলাবে, পাঠের মাধ্যম বদলাবে, মানুষের জীবনযাপন বদলাবে কিন্তু প্রেম, বেদনা, স্বপ্ন, প্রতিবাদ ও মানবিকতার গল্প যতদিন থাকবে, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যও ততদিন নতুন পাঠকের কাছে নতুন অর্থ নিয়ে ফিরে আসবে।

এই কারণেই তিনি কালজয়ী ঔপন্যাসিক যাঁর সাহিত্য কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, বর্তমানের পাঠ এবং ভবিষ্যতেরও সম্পদ।