
ভোলার উপকূলীয় নদ-নদীতে দেখা দিয়েছে বড় আকারের ইলিশের সমারোহ। গত দুই সপ্তাহ ধরে মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবাদর, বেতুয়া, বুড়াগৌরঙ্গ ও ইলিশা নদীতে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে বড় ও মাঝারি আকারের বিপুলসংখ্যক ইলিশ। এতে জেলে, আড়ৎদার ও মাছ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ফিরেছে স্বস্তি।
মৎস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, নদীতে ইলিশের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় ও দেশের চাহিদা মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ইলিশ বিদেশে রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভোলার বিভিন্ন নদী ও মাছঘাটে ইলিশ আহরণ, পরিবহন ও কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলে, আড়ৎদার ও ব্যবসায়ীরা।
ভোলা সদর উপজেলার ইলিশা মাছঘাট আড়ৎ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাদশা মিয়া বলেন, গত চার সপ্তাহ ধরে জেলেদের জালে মূলত ২০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ধরা পড়ছিল। দামও ছিল তুলনামূলক বেশি। ফলে দুই থেকে আড়াই কেজি ওজনের ইলিশ না পাওয়ায় মোকামে মাছ পাঠানো সম্ভব হচ্ছিল না।
তবে গত এক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন জেলেদের জালে বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে। এতে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি ইলিশ বিদেশে রপ্তানির কথা ভাবছেন ব্যবসায়ীরা।
একই ঘাটের আড়ৎদার আবু বকর ও মোফাজ্জল মাঝি জানান, বড় আকারের ‘রাজা ইলিশ’ ধরা পড়ায় ঘাটগুলোতে বেচাকেনা বেড়েছে। সরবরাহ বেশি থাকায় সাধারণ ক্রেতারাও তুলনামূলক কম দামে নিজেদের সাধ্যের মধ্যে ইলিশ কিনতে পারছেন।
কমেছে ইলিশের দাম
জেলেরা জানান, নদীতে ইলিশের সরবরাহ বাড়ায় কয়েকদিনের ব্যবধানে দামও কমেছে।
তাদের তথ্য অনুযায়ী, কিছুদিন আগে ৫০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ বিক্রি হতো প্রায় ৬০০ টাকায়। এখন একই আকারের মাছ পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৩০০ টাকায়। ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের দাম আগে ছিল প্রায় ১ হাজার ১০০ টাকা, যা বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকায়।
ভোলার তুলাতুলি মেঘনা নদীর জেলে আবু ফরাজী আব্দুল্লাহ মাঝি ও নাইমুদ্দিন মাঝি জানান, রোববার দিবাগত রাতে নদীতে জাল ফেলে তাঁরা প্রায় ৩৬ কেজি বড় আকারের ইলিশ পেয়েছেন। বড় মাছগুলো আড়তে বিক্রি করলেও ছোট মাছগুলো তাঁরা বাড়িতে নিয়ে গেছেন।
মনপুরায় সাড়ে ৩ কেজির ইলিশ
ভোলার সাগর মোহনার উপজেলা মনপুরার মেঘনা নদীতেও জেলেদের জালে নিয়মিত বড় ইলিশ ধরা পড়ছে। সেখানে আড়াই থেকে সাড়ে ৩ কেজি ওজনের ইলিশ পাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
রোববার মনপুরার মেঘনা নদীতে ধরা পড়া দুটি বড় ‘রাজা ইলিশ’ নিলামে ১৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে।
মৎস্য ব্যবসায়ী আমির হোসেন মাঝি জানান, বিকেলে উপজেলার ৫ নম্বর কলাতলী ইউনিয়নের ঢালচর মৎস্যঘাটে জেলে রফিক মাঝি দুটি বড় ইলিশ নিয়ে আসেন। পরে নিলামে মাছ দুটি ১৫ হাজার টাকায় কিনে নেন ব্যবসায়ী ফরহাদ হাওলাদার।
জেলে রফিক মাঝি বলেন, নদীতে জাল ফেলার পর অন্যান্য ছোট মাছের সঙ্গে বড় আকারের দুটি ইলিশও ধরা পড়ে। পরে মাছ দুটি আলাদা করে আড়তে এনে নিলামে বিক্রি করা হয়।
সামরাজ বন্দরে জমজমাট বেচাকেনা
চরফ্যাশন উপজেলার সামরাজ মৎস্য বন্দরেও বড় আকারের ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। জেলে ও আড়ৎদারদের ব্যস্ততায় বন্দর এখন সরগরম।
সামরাজ বন্দরের আড়ৎদার মো. ঈমাম হোসেন পাটওয়ারী জানান, বড় সাইজের ইলিশ পাওয়ায় বেচাকেনা বেড়েছে। প্রতিদিন এই বন্দর থেকে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ ইলিশ সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে বড় ইলিশ ধরা পড়ছে, তাতে স্থানীয় ও দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ইলিশ বিদেশে রপ্তানির প্রস্তুতি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।
লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২ লাখ টন
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ভোলায় ইলিশ আহরণ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার থেকে ১ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন।
জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার। এর বাইরে অনিবন্ধিত জেলে রয়েছেন আরও দুই লাখের বেশি।
মনপুরা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, কিছুদিন আগেও মেঘনায় ইলিশের সংকট ছিল। এখন বড় আকারের ইলিশ জেলেদের জালে ধরা পড়ায় এটি স্বস্তির খবর। সামনে আরও বড় ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, মেঘনা-তেঁতুলিয়া ও জেলার বিভিন্ন শাখা নদীতে ইলিশ সংরক্ষণে পরিচালিত অভিযানের সুফল পাওয়া যাচ্ছে। নদীতে বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ছে। জেলেরা নিষেধাজ্ঞা মেনে আরও সচেতন হলে ইলিশের উৎপাদন ও আকার দুটিই বাড়বে।
মৎস্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মেঘনা মোহনা দেশের অন্যতম প্রধান ইলিশ আহরণ এলাকা। নদীর পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে আরও বড় আকারের ইলিশ ধরা পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বৈদেশিক বাজারে ইলিশ রপ্তানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
উল্লেখ্য, ভোলার মেঘনা নদীর চর ইলিশা থেকে চর পিয়াল পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে। এছাড়া তেঁতুলিয়া নদী এলাকাতেও মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।