
আগেই ধারণা করা হচ্ছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা ভালো ফল করবে। তবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই দলটি এতটা শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে, তা অনেকের ধারণার বাইরে ছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে ছিল কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফলে ক্ষমতার প্রথম দুই বছরে আইন প্রণয়ন কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কংগ্রেসের কাছ থেকে বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়নি তাঁকে। কিন্তু এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল সেই রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই বদলে দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্রমেই কমেছে। এবারের নির্বাচনে মার্কিন ভোটাররা যেন সেই অসন্তোষেরই প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। এমনকি সাধারণত ভোটদানে অনাগ্রহী অনেক ভোটারও এবার আগ্রহ নিয়ে ভোটকেন্দ্রে গেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কী কারণে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় এমন ধস নামল? কেনই বা রিপাবলিকানদের ওপর থেকে আস্থা হারালেন মার্কিন ভোটারদের একটি বড় অংশ?
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ইরান যুদ্ধ। ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে ব্যাপকভাবে। এর প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক অর্থনীতিতে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে, অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি মানুষের আয় ও বেতন। ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তও অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং এসব নীতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ভোক্তা পর্যায়ে চাপ তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নাগরিকত্ব পরীক্ষা ও অভিবাসনসংক্রান্ত পদক্ষেপের নামে সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগও ট্রাম্প প্রশাসনের জনপ্রিয়তায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক চাপ, যুদ্ধের প্রভাব এবং প্রশাসনের বিতর্কিত নীতির বিরুদ্ধে ভোটারদের ক্ষোভ নির্বাচনে প্রতিফলিত হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অনেক আসনেও জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা। সিনেটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে এই পরিবর্তনের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কানসাসে ১৯৩২ সালের পর এই প্রথম সিনেটে আসন পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। সেখানে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন অ্যাডাম হ্যামিল্টন। টেক্সাসেও ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন জেমস টলারিকো। সাউথ ক্যারোলাইনা ও নর্থ ক্যারোলাইনাতেও দীর্ঘ বিরতির পর সিনেটে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করেছেন ডেমোক্র্যাটরা।
বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় মেইনের কথা। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করা রিপাবলিকান সুসান কলিন্স এবার পরাজিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ট্রয় জ্যাকসনের কাছে। এসব ফলাফল থেকে স্পষ্ট, রিপাবলিকানদের ঐতিহ্যগত শক্তিশালী নির্বাচনী এলাকাগুলোতেও এবার বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ট্রাম্পবিরোধী জনমত যে কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, এসব আসনের ফলাফল তারই ইঙ্গিত দেয়।
আগামী ৩ জানুয়ারি নতুন কংগ্রেসের মেয়াদ শুরু হবে। সেদিন থেকেই দায়িত্ব গ্রহণ করবেন নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা। তার আগ পর্যন্ত বর্তমান কংগ্রেসের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে। তবে নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেওয়ার পর পরিস্থিতি অনেকটাই বদলে যাবে। নতুন আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, সরকারি অর্থ বরাদ্দ এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে ডেমোক্র্যাটদের বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাও পাবে কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো। ফলে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামতই শেষ কথা। ক্ষমতাসীনদের জনপ্রিয়তা যতই থাকুক, জনস্বার্থ উপেক্ষা করে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিতে থাকলে একসময় ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমেই তার জবাব দেন। তবে সেই জবাব কার্যকর করতে হলে নির্বাচন হতে হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। এবারের নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের রায় ট্রাম্প প্রশাসনকে কতটা সংযত করতে পারে এবং দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভারসাম্যে কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, তা সময়ই বলে দেবে।