News update
  • বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ১৫তম     |     
  • হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলতে ইরানের ছয় শর্ত     |     
  • দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করুন: ইউএনওদের প্রধানমন্ত্রী     |     
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়বে জামায়াত, রোববার প্রার্থী ঘোষণা     |     
  • তনু হত্যা মামলা: জামিন স্থগিত, ফের গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাফিজুর     |     
বিনোদন 2026-08-09, 8:11am

রুপালি পর্দার জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের একাল-সেকাল

kanson-47a091df3e448140b5b32dd2c22e51fd1786241506.jpg


বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। একসময় তার নামেই প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ঢল নামত। ‘বেদের মেয়ে জোছনা’সহ অসংখ্য সিনেমায় অভিনয় করে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন কোটি দর্শকের হৃদয়ে। তবে সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে তার জীবন। এখন রুপালি পর্দার সেই দাপুটে নায়ক লড়ছেন গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে।



পর্দায় যার ছিল রাজত্ব


১৯৭৭ সালে ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু করেন ইলিয়াস কাঞ্চন। ধীরে ধীরে নায়ক হিসেবে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা।



‘বেদের মেয়ে জোসনা’—যে সিনেমা বদলে দিয়েছিল ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবন


১৯৮৯ সালের ৯ জুন মুক্তি পায় তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। এতে রাজকুমার চরিত্রে অভিনয় করেন ইলিয়াস কাঞ্চন, আর জোসনা চরিত্রে ছিলেন অঞ্জু ঘোষ। সিনেমাটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অন্যতম বড় ব্যবসাসফল ও জনপ্রিয় ছবি হিসেবে বিবেচিত।


ছবিটি করার সময় ইলিয়াস কাঞ্চন ছিলেন ক্যারিয়ারের তুঙ্গে। তার প্রায় তিন বছরের শিডিউল আগেই বুক করা ছিল। এমনকি শুরুতে এই সিনেমায় তার অভিনয় করার কথাও ছিল না। পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল তাকে ছাড়া সিনেমাটি করতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনি অভিনয়ে সম্মতি দেন।


ছবিটি মুক্তির পর প্রথমদিকে খুব বেশি সাড়া না পেলেও দর্শকের মুখে মুখে এর প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে সিনেমাটি পরিণত হয় তুমুল জনপ্রিয়তায়। বিভিন্ন সূত্রে ছবিটির আয় ২১ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকার বেশি বলা হয়েছে।


এরপর একের পর এক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি। **‘পরিণীতা’, ‘ভেজা চোখ’, ‘সুখের ঘরে দুখের আগুন’, ‘অচল পয়সা’, ‘ত্যাগ’, ‘স্বজন’, ‘চেয়ারম্যান’**সহ অসংখ্য সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করে।


অভিনয়ের স্বীকৃতিও এসেছে বারবার। ‘পরিণীতা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতা এবং ‘শাস্তি’ চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার পান তিনি। ২০২১ সালে পান জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা।



ব্যক্তিগত বেদনাই বদলে দেয় জীবন


১৯৯৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনের মৃত্যু ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। এরপর তিনি সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির আন্দোলনে যুক্ত হন।


গড়ে তোলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন। দীর্ঘদিন ধরে সড়কে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনা কমানো এবং চালক ও পথচারীদের সচেতন করার দাবিতে কাজ করে আসছেন তিনি।


এই সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন।


এবার নিজের জীবন নিয়েই কঠিন লড়াই


জীবনের বড় একটি সময় অন্যের জীবন রক্ষার দাবিতে সোচ্চার থাকা ইলিয়াস কাঞ্চন এখন নিজেই লড়ছেন কঠিন অসুস্থতার সঙ্গে।


মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করেন। ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট লন্ডনের একটি হাসপাতালে তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপরও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।


২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, লন্ডনে তার কেমোথেরাপির দ্বিতীয় ধাপের চিকিৎসা চলছিল। তখনও তার শারীরিক অবস্থা পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন।


এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শারীরিকভাবে তিনি কিছুটা সুস্থ হলেও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন এবং বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে কাউন্সেলিং চলছিল। পাশাপাশি চলছিল ওরাল কেমোথেরাপি।


দেশে ফিরেও পুরোপুরি স্বাভাবিক নন


দীর্ঘ ১৫ মাসের বেশি সময় লন্ডনে চিকিৎসা নেওয়ার পর গত ৩ আগস্ট দেশে ফিরেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তবে দেশে ফেরার পর তার শারীরিক অবস্থার পাশাপাশি স্মৃতিশক্তি নিয়েও উদ্বেগের কথা সামনে এসেছে।


সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ঘনিষ্ঠজনদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, তিনি অনেক পরিচিত মানুষকে চিনতে পারছেন না। অনেক ঘটনা ও বিষয়ও মনে করতে পারছেন না। দেশে ফেরার পর তার সঙ্গে দেখা করতে যান অভিনেতা আলমগীর। প্রায় দুই ঘণ্টা সময় কাটিয়ে তিনি পুরোনো দিনের নানা স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।


অর্থাৎ, একসময় যিনি পর্দায় সংলাপ, অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন, সেই মানুষটিই এখন স্মৃতি ও অসুস্থতার সঙ্গে এক কঠিন লড়াই করছেন।


একাল-সেকালের ব্যবধান


একসময় ইলিয়াস কাঞ্চন ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক। প্রেক্ষাগৃহে তার সিনেমা মানেই ছিল দর্শকের উচ্ছ্বাস। পোস্টারে তার ছবি দেখেই সিনেমা দেখতে ছুটতেন মানুষ।


আজ সেই ইলিয়াস কাঞ্চন অনেকটাই আড়ালে। নেই আগের মতো চলচ্চিত্রে ব্যস্ততা। নেই নিয়মিত শুটিং। দীর্ঘ চিকিৎসা আর অসুস্থতার কারণে জীবনও অনেকটাই বদলে গেছে।


তবু মানুষের ভালোবাসায় তার জায়গাটি বদলায়নি।


নায়ক হিসেবে তিনি পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। সামাজিক আন্দোলনে পেয়েছেন মানুষের শ্রদ্ধা। আর এখন অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে তার ভক্ত ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তার সুস্থতার জন্য দোয়া করছেন।


রুপালি পর্দার নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের জীবনের একাল-সেকাল তাই শুধু একজন তারকার গল্প নয়; এটি জনপ্রিয়তা, ব্যক্তিগত বেদনা, মানুষের জন্য লড়াই এবং শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের সঙ্গে এক কঠিন সংগ্রামের গল্প।