
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এমন কিছু চরিত্র আছে, যেগুলো কোনো একটি সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে অভিনেতার সঙ্গে স্থায়ীভাবে মিশে যায়। বাপ্পারাজের ক্ষেত্রে ‘ব্যর্থ প্রেমিক’ চরিত্রটি তেমনই এক পরিচয়। পর্দায় তিনি বারবার প্রেম হারিয়েছেন, প্রিয় মানুষকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছেন, কখনো নীরবে সরে দাঁড়িয়েছেন, কখনো আত্মত্যাগ করেছেন। কিন্তু সেই পরাজয়ই তাঁকে দিয়েছে আলাদা এক জনপ্রিয়তা। নব্বইয়ের দশকের দর্শকের কাছে বাপ্পারাজ শুধু একজন নায়ক নন, তিনি ছিলেন বিরহ, ত্যাগ আর অপূর্ণ ভালোবাসার এক পরিচিত মুখ।
মজার বিষয় হলো, শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই অভিনেতার ক্যারিয়ারে ব্যর্থ প্রেমিকের চরিত্র ছিল মোটেও সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বাপ্পারাজ নিজেই জানিয়েছেন, প্রায় ১০০ ছবির মধ্যে ৮-১৫টির মতো ছবিতে তাঁকে এ ধরনের চরিত্রে দেখা গেছে। অথচ দর্শকের স্মৃতিতে সেই কয়েকটি চরিত্রই অন্য অনেক চরিত্রকে ছাপিয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, ব্যর্থ প্রেমিক হয়েই তিনি সফল হয়েছেন।
বাপ্পারাজ চলচ্চিত্রে আসেন এমন এক পরিবার থেকে, যেখানে অভিনয় ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। তাঁর বাবা ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক রাজ্জাক। ১৯৮৬ সালে রাজ্জাক পরিচালিত ‘চাঁপাডাঙ্গার বউ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় বাপ্পারাজের। প্রথম দিকেই তিনি বুঝিয়ে দেন, শুধু পারিবারিক পরিচয়ের কারণে নয়, অভিনয়ের নিজস্ব দক্ষতাতেও তিনি জায়গা করে নিতে চান।
অভিষেকের পর ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করতে থাকেন তিনি। অ্যাকশন, পারিবারিক গল্প, রোমান্টিক সিনেমা বিভিন্ন ধারার চলচ্চিত্রেই তাঁকে দেখা গেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাঁর অভিনয়ের একটি বিশেষ দিক দর্শকদের কাছে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে ত্যাগী প্রেমিকের চরিত্র।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের একটি জনপ্রিয় কাঠামো ছিল ত্রিভুজ প্রেম। নায়ক-নায়িকার ভালোবাসার মাঝে তৃতীয় একজনের উপস্থিতি, ভুল বোঝাবুঝি, সামাজিক বাধা কিংবা পারিবারিক সিদ্ধান্তশেষ পর্যন্ত প্রেম পূর্ণতা পেত না। এই গল্পে অনেক সময় প্রধান নায়কের পাশাপাশি এমন একজন চরিত্র থাকত, যে নিজের ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে অন্যের সুখ নিশ্চিত করত।
বাপ্পারাজ এই চরিত্রে অসাধারণভাবে মানিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর মুখের অভিব্যক্তি, সংলাপ বলার ধরন এবং আবেগঘন দৃশ্যে অভিনয় তাঁকে ত্যাগী প্রেমিক হিসেবে আলাদা করে তোলে। ‘প্রেমের সমাধি’, ‘প্রেমগীত’, ‘হারানো প্রেম’, ‘ভুলোনা আমায়’, ‘বুক ভরা ভালোবাসা’ ও ‘ভালোবাসা কারে কয়’-এর মতো চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই ইমেজ আরও শক্তিশালী হয়।
তবে বাপ্পারাজের নিজের বক্তব্যও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, দর্শক তাঁকে এই চরিত্রে দেখতে চাইতেন বলেই পরিচালকরা তাঁর ওপর আস্থা রাখতেন। অর্থাৎ এটি কেবল নির্মাতাদের পছন্দ ছিল না; দর্শকের চাহিদাও তাঁর ‘ব্যর্থ প্রেমিক’ ইমেজ তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
বাপ্পারাজের ক্যারিয়ারের সঙ্গে ব্যর্থ প্রেমের প্রসঙ্গ তুললে ‘প্রেমের সমাধি’ নামটি বিশেষভাবে আসে। ত্রিভুজ প্রেমের আবেগ, সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং আত্মত্যাগের গল্পে তাঁর চরিত্র দর্শকদের আবেগে নাড়া দিয়েছিল। একই ধারার আরও কিছু সিনেমা তাঁর জনপ্রিয়তাকে স্থায়ী করে।
পর্দায় তাঁর চরিত্রগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল প্রেম হারানোর পরও প্রতিশোধপরায়ণ না হওয়া। বরং অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজের কষ্ট আড়াল করে প্রিয় মানুষের সুখকে মেনে নিতেন। এই আত্মত্যাগী মানসিকতাই দর্শকের কাছে তাঁকে আলাদা করে তুলেছিল।
সে সময়ের সিনেমায় প্রেমের ব্যর্থতা ছিল কেবল ব্যক্তিগত বেদনা নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকত গান, সংলাপ, চিঠি, বিচ্ছেদ, আত্মত্যাগ এবং কখনো মৃত্যুও। বাপ্পারাজের অভিনয় সেই আবেগকে দর্শকের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছিল।
বাপ্পারাজের ক্ষেত্রে সবচেয়ে মজার বৈপরীত্য হলো তিনি পর্দায় প্রেমে ব্যর্থ হলেও অভিনেতা হিসেবে সেই ব্যর্থতাকেই সাফল্যে পরিণত করেছেন। এ কারণেই তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘ব্যর্থ প্রেমের সফল নায়ক’ পরিচয়টি।
নিজের এই পরিচয় নিয়ে বাপ্পারাজের কোনো আক্ষেপ নেই। বরং তিনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যদি ১০০টি সিনেমার মধ্যে মাত্র কয়েকটি ছবির চরিত্র মানুষের মনে এত গভীরভাবে জায়গা করে নেয়, সেটিই একজন শিল্পীর সাফল্য। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই চরিত্রগুলোই তাঁকে দর্শকের মনে আলাদা করে রেখেছে।
২০২৩ সালে ‘অসম্ভব’ সিনেমাকে ঘিরে এক সাক্ষাৎকারেও বাপ্পারাজ বলেন, তাঁর অভিনীত ব্যর্থ প্রেমের চরিত্রের সংখ্যা তাঁর মোট চলচ্চিত্রের তুলনায় খুব বেশি নয়। কিন্তু ওই চরিত্রগুলো দর্শকের কাছে ভালো লেগেছে বলেই সেগুলো তাঁকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রেখেছে।
বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমায় সাধারণত দর্শকের মনোযোগ থাকে প্রধান নায়ককে ঘিরে। কিন্তু বাপ্পারাজের ক্ষেত্রে অনেক সময় গল্পের প্রধান নায়কের চেয়ে তাঁর চরিত্রের আবেগই দর্শকের মনে বেশি দাগ কাটত। প্রেমে হেরে যাওয়া মানুষটির কান্না, প্রিয় মানুষকে ছেড়ে দেওয়ার দৃশ্য কিংবা নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দেওয়ার মুহূর্ত দর্শককে আবেগপ্রবণ করত।
বাপ্পারাজ নিজেও বিষয়টিকে তাঁর অভিনয়জীবনের একটি অর্জন হিসেবে দেখেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিনেমায় হিরোকে ছাপিয়ে যাওয়া তাঁর চরিত্রগুলোর একটি বিশেষ কৃতিত্ব।
এই জায়গাটিই বাপ্পারাজকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি প্রচলিত অর্থে সবসময় বিজয়ী নায়ক ছিলেন না; বরং অনেক গল্পে তাঁর চরিত্রের শক্তি ছিল পরাজয় মেনে নেওয়ার মধ্যে।
সময়ের সঙ্গে চলচ্চিত্রের মাধ্যম বদলেছে। সিনেমা হলের পাশাপাশি ইউটিউব, ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন পুরোনো সিনেমার দৃশ্যকে নতুন দর্শকের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। ফলে বাপ্পারাজের পুরোনো সিনেমার সংলাপ ও বিরহের দৃশ্যও নতুন করে আলোচনায় আসে।
বিশেষ করে প্রেমে ব্যর্থতার নানা পরিস্থিতিতে তাঁর সিনেমার দৃশ্য ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের পোস্ট, মিম ও ভিডিও তৈরি হয়। ফলে যে চরিত্রগুলো একসময় সিনেমা হলের দর্শকের আবেগকে নাড়া দিয়েছিল, সেগুলো এখন নতুন প্রজন্মের কাছেও এক ধরনের পপ-কালচার হয়ে উঠেছে।
এখানেই বাপ্পারাজের জনপ্রিয়তার আরেকটি দিক দেখা যায়। একটি নির্দিষ্ট সময়ের সিনেমার চরিত্র কীভাবে কয়েক দশক পরেও মানুষের কথাবার্তা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিতে পারে, তাঁর ক্যারিয়ার তার একটি উদাহরণ।
পর্দার বাপ্পারাজ যতই ব্যর্থ প্রেমিক হন, বাস্তব জীবনের গল্প তাঁর সিনেমার গল্পের মতো নয়। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে নিজের ব্যক্তিজীবনের প্রেমের প্রসঙ্গেও তিনি বলেছেন, বাস্তবে তাঁর প্রেমের গল্প সফল হয়েছে। এমনকি এক সাক্ষাৎকারে তিনি রসিকতা করে বলেন, সিনেমায় প্রেমে ব্যর্থ হলেও বাস্তব জীবনে প্রেমের ক্ষেত্রে তিনি সফল।
এই বৈপরীত্যই বাপ্পারাজের ‘ব্যর্থ প্রেমিক’ পরিচয়কে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। দর্শক যে মানুষটিকে পর্দায় বারবার ভালোবাসা হারাতে দেখেছেন, বাস্তব জীবনে সেই মানুষটির গল্প ছিল ভিন্ন।
বাপ্পারাজের ক্যারিয়ারকে কেবল ব্যর্থ প্রেমিকের চরিত্র দিয়ে বিচার করলে তাঁর অভিনয়জীবনের বড় একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি অ্যাকশন, পারিবারিক গল্প ও অন্যান্য ধারার চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। ‘বাবা কেন চাকর’, ‘জজ ব্যারিস্টার’, ‘ঢাকা ৮৬’, ‘জ্বিনের বাদশা’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাঁর ভিন্ন ধরনের চরিত্র দেখা গেছে।
তবে একজন শিল্পীর ক্যারিয়ারে কখনো কখনো একটি বিশেষ চরিত্রই তাঁর পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হয়ে ওঠে। বাপ্পারাজের ক্ষেত্রে সেটি হয়েছে ব্যর্থ প্রেমিকের চরিত্র। তিনি নিজেও বলেছেন, বারবার একই ধরনের চরিত্র করতে সবসময় আগ্রহী ছিলেন না; বয়স ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভারী ও ভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের আগ্রহ তাঁর ছিল।
বাপ্পারাজের ব্যর্থ প্রেমিক চরিত্র জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে কেবল কান্না বা বিচ্ছেদ কাজ করেনি। বরং তাঁর চরিত্রগুলোর মধ্যে ছিল আবেগ, আত্মত্যাগ এবং এক ধরনের নীরব মানবিকতা। তিনি প্রেমে হারতেন, কিন্তু অনেক গল্পে সেই হারকে মেনে নেওয়ার মধ্যেই চরিত্রের মহত্ত্ব প্রকাশ পেত।
তাই ‘ব্যর্থ প্রেমের নায়ক’ পরিচয়টি তাঁর জন্য নিছক একটি রসিকতা নয়; এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে তাঁর একটি স্বতন্ত্র অবস্থান। যে অভিনেতা পর্দায় বারবার ভালোবাসা হারিয়েছেন, তিনিই দর্শকের ভালোবাসায় দীর্ঘদিন টিকে আছেন।
আজকের দর্শকের কাছে বাপ্পারাজ হয়তো নিয়মিত পর্দার নায়ক নন। কিন্তু পুরোনো সিনেমার কোনো বিরহের দৃশ্য, কোনো সংলাপ কিংবা কোনো আত্মত্যাগী প্রেমিকের চরিত্র সামনে এলেই তাঁর নাম মনে পড়ে। এটাই তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য পর্দায় প্রেমে ব্যর্থ, কিন্তু দর্শকের ভালোবাসায় সফল।