News update
  • শুক্র ও শনিবার হজ-সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা খোলা রাখার নির্দেশ     |     
  • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গেটস ফাউন্ডেশনের সিইও'র সাথে বৈঠক     |     
  • ইউপি নির্বাচনের জন্য ৪২ প্রতীক চূড়ান্ত     |     
  • বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপ: খাবার ও পানি মজুতের নির্দেশ     |     
  • চালকের আসনে কিশোর, আসামির তালিকায় অন্যজন     |     
বঙ্গলোক ডেস্ক ধর্ম ও জীবন 2026-09-17, 10:28am

নবীজির কান্না: উম্মতের জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত

sm-ed79acb0cd3d7f8320c53c7798335ef01789619306.jpg


রাসুলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মানবজাতির জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর জীবনে হাসি যেমন ছিল, তেমনি ছিল অশ্রুসিক্ত মুহূর্তও। তিনি আল্লাহর ভয়, ইবাদতের গভীরতা, কোরআন তিলাওয়াত, উম্মতের প্রতি মমতা এবং প্রিয়জনের বিচ্ছেদে কেঁদেছেন। তাঁর কান্না ছিল দুর্বলতার প্রকাশ নয়; বরং তা ছিল কোমল হৃদয়, আল্লাহভীতি ও গভীর ঈমানের বহিঃপ্রকাশ।

কোরআন শুনে নবীজি (সা.)-এর কান্না

একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-কে কোরআন তিলাওয়াত করতে বলেছিলেন। ইবনে মাসউদ (রা.) সূরা নিসার একটি আয়াত পড়ছিলেন। যখন তিনি এই আয়াতে পৌঁছান

‘আমি যখন প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষী আনব এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব তখন কী অবস্থা হবে?’

তখন নবীজি (সা.) বললেন, ‘থামো।’

ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, তিনি দেখলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হচ্ছে।

-সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

এই ঘটনা দেখায়, কোরআনের আয়াত তাঁর হৃদয়ে কত গভীরভাবে প্রভাব ফেলত।

নামাজে নবীজির কান্না

রাসুলুল্লাহ (সা.) দীর্ঘ সময় রাতের নামাজ আদায় করতেন। নামাজে দাঁড়িয়ে তিনি কোরআন তিলাওয়াত করতেন এবং আল্লাহর সামনে বিনয় ও ভয়ে কাঁদতেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে শিখখির (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি নবীজি (সা.)-এর কাছে গিয়ে দেখেছেন, তিনি নামাজ আদায় করছেন। তাঁর বুক থেকে কান্নার কারণে এমন শব্দ হচ্ছিল, যেন ফুটন্ত পাত্রের শব্দ।

-সুনানে আবু দাউদ, নাসাঈ

এটি ছিল এমন কান্না, যা কেবল চোখের পানিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; হৃদয়ের গভীর অনুভূতি তাঁর শরীরেও প্রকাশ পেত।

উম্মতের জন্য কান্না

রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর উম্মতের প্রতি অসীম মমতা পোষণ করতেন। কোরআনেও তাঁর উম্মতের প্রতি গভীর মমতার কথা এসেছে।

আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসুল। তোমাদের যে কষ্ট হয়, তা তাঁর কাছে অত্যন্ত কষ্টদায়ক; তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল ও পরম দয়ালু।’

-সূরা আত-তাওবা: ১২৮

হাদিসে এসেছে, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ইবরাহিম (রা.)-এর মৃত্যুর সময় কেঁদেছিলেন। সাহাবিরা তাঁর কান্না দেখে বিস্মিত হলে তিনি জানান, এটি রহমতের কান্না। এরপর তিনি বলেন, চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় দুঃখিত হয়; তবে আমরা এমন কথা বলি না, যা আমাদের রবকে অসন্তুষ্ট করে।

সন্তানের মৃত্যুতে কান্না

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সন্তান ইবরাহিম (রা.) যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তিনি অত্যন্ত দুঃখ পেয়েছিলেন। তাঁর চোখে অশ্রু এসেছিল।

তিনি বলেন, ‘চোখ অশ্রু ঝরায়, হৃদয় দুঃখিত হয়; কিন্তু আমরা এমন কিছু বলব না, যাতে আমাদের রব সন্তুষ্ট না হন।’

এই ঘটনা মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। প্রিয়জনের মৃত্যুতে কাঁদা নিষিদ্ধ নয়। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক আবেগকে অস্বীকার করে না। তবে শোকের সময় আল্লাহর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা, বিলাপ করা বা নিয়তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকতে হয়।

আল্লাহর ভয়ে কান্না

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না এমনকি দুধ ওলানে ফিরে না আসা পর্যন্তও নয়।

-জামে তিরমিজি

অর্থাৎ আল্লাহর ভয় থেকে মানুষের অন্তরে যে অনুতাপ ও বিনয় সৃষ্টি হয়, তা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

আরেক হাদিসে এমন সাত শ্রেণির মানুষের কথা এসেছে, যাদের কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর আরশের ছায়া দেবেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন সেই ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে যায়।

-সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

নবীজির কান্না আমাদের কী শেখায়?

নবীজি (সা.)-এর কান্না আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়

১. কান্না দুর্বলতার লক্ষণ নয়একজন পুরুষের কাঁদা লজ্জার বিষয় নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেই কেঁদেছেন।

২. আল্লাহভীতি হৃদয়কে নরম করেকোরআন ও আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরে এমন প্রভাব সৃষ্টি করে, যার বহিঃপ্রকাশ অশ্রু হয়ে আসে।

৩. প্রিয়জনের জন্য কাঁদা বৈধস্বাভাবিক শোক ও অশ্রু ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। নিষিদ্ধ হলো এমন বিলাপ, যা শরিয়তের সীমা অতিক্রম করে।

৪. উম্মতের প্রতি ভালোবাসা ঈমানের সৌন্দর্যনবীজি (সা.) তাঁর উম্মতের কল্যাণ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে মানুষের প্রতি দয়া ও মমতার প্রকাশ পাওয়া যায়।

৫. কোরআন শুধু পড়ার বিষয় নয়, অনুভব করার বিষয়নবীজি (সা.) কোরআনের আয়াত শুনে কেঁদেছেন। তাই কোরআন তিলাওয়াতের সময় শুধু শব্দ উচ্চারণ নয়, অর্থ উপলব্ধি করারও চেষ্টা করা উচিত।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, অথচ তাঁর হৃদয় ছিল অত্যন্ত কোমল। আল্লাহর মহত্ত্ব স্মরণে তাঁর চোখ অশ্রুসিক্ত হয়েছে, কোরআনের আয়াত শুনে তিনি কেঁদেছেন, প্রিয়জনের মৃত্যুতে তাঁর চোখে পানি এসেছে এবং উম্মতের কল্যাণ নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন।

তাঁর কান্না আমাদের শেখায় কোমল হৃদয় ঈমানের সৌন্দর্য, আর আল্লাহর সামনে অশ্রু ফেলা ইবাদতের এক গভীর অনুভূতি।