
আড়িয়াল বিলের দেশীয় পাঁচ প্রজাতির ছোট মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক। গবেষণায় সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে। এছাড়া বাটা, মেনি (ভেদা/নান্দিনা), গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব মিলেছে।
গবেষকদের মতে, বর্তমানে এসব মাছ খাওয়ার ফলে তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যঝুঁকির সুস্পষ্ট প্রমাণ না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে মানবস্বাস্থ্য, জলজ বাস্তুতন্ত্র এবং খাদ্যনিরাপত্তার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও বাকৃবির ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান জানান, ২০২৪ সালের বর্ষা, ২০২৪-২৫ সালের শীত এবং ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে আড়িয়াল বিলের গাদীঘাট, বসুরোলা ডেঙ্গা, সাগর ডেঙ্গা, বড়াইখালী ও আলমপুর এলাকা থেকে পানি, পলিমাটি ও মাছের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে পরীক্ষাগারে এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে মাছের বিভিন্ন অঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, সর্বভুক স্বভাবের কারণে কই মাছে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক জমা হয়েছে। তিন মৌসুমেই কই মাছের মাংসপেশিতে গড়ে প্রায় একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। এছাড়া অন্ত্রে গড়ে ১.৭০ থেকে ১.৯০টি এবং ফুলকায় ১.৩০ থেকে ১.৪০টি কণা শনাক্ত হয়েছে।
কই মাছের পর সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে বাটা মাছে। এর অন্ত্রে বর্ষা মৌসুমে গড়ে সর্বোচ্চ ১.৫০টি কণা এবং মাংসপেশিতে ০.৮০ থেকে ০.৯০টি কণা পাওয়া গেছে। মেনি ও গুলশা টেংরা মাছের অন্ত্রেও শীত ও শুষ্ক মৌসুমে তুলনামূলক বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে পুঁটি মাছে সবচেয়ে কম মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মাংসপেশিতে মাত্র ০.৫০ থেকে ০.৫১টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১.৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২.৩৩ থেকে ১২৭.৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। বর্ষাকালে পানিতে প্লাস্টিক দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল।
ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড (এফটি-আইআর) স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া কণার ৩৪ থেকে ৬৩ শতাংশই ছিল মাইক্রোফাইবার। গবেষকদের মতে, এসব কণার প্রধান উৎস কাপড় ধোয়ার সময় নির্গত কৃত্রিম তন্তু, গৃহস্থালির বর্জ্যপানি এবং মাছ ধরার প্লাস্টিক জাল। এছাড়া ভাঙা শক্ত প্লাস্টিক, পলিথিনের ফিল্ম ও ফোমজাতীয় কণাও শনাক্ত হয়েছে।
রাসায়নিক বিশ্লেষণে পলিইথিলিন (পিই), পলিপ্রোপিলিন (পিপি), পলিস্টাইরিন (পিএস), পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি) এবং পলিকার্বোনেট (পিসি) পাওয়া গেছে। এসব উপাদান সাধারণত প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল, মোড়ক, প্যাকেজিং সামগ্রী ও বিভিন্ন গৃহস্থালি পণ্যে ব্যবহৃত হয়।
অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান বলেন, "আতঙ্ক নয়, এখন প্রয়োজন উৎস থেকেই প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। তবে দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক জমতে থাকলে ভবিষ্যতে এর প্রভাব দেখা দিতে পারে। হয়তো পাঁচ বা দশ বছরে নয়, ২৫ থেকে ৩০ বছর পর কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও এর প্রভাব প্রকাশ পেতে পারে।"