
প্রবল এল নিনো ও সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতায় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী ঘূর্ণিঝড়ের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক তারিখরেখার পূর্বাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সম্মিলিত শক্তি ২০১৮ সালের আগের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। একই সঙ্গে একের পর এক শক্তিশালী ঝড় তৈরি হওয়ায় চলতি মৌসুমের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সোমবার, ১২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ সেপ্টেম্বর ঘূর্ণিঝড় ওডালিস গঠনের পর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে একের পর এক শক্তিশালী ঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। নোলো, ওডালিস, পোলো, র্যাচেল ও সিমন নামের পরপর পাঁচটি ঘূর্ণিঝড়ই শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছেছে। এসব ঝড়ের বাতাসের গতি ঘণ্টায় অন্তত ১১১ মাইল বা প্রায় ১৭৯ কিলোমিটারে পৌঁছেছিল।
কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির ঘূর্ণিঝড় গবেষক ফিল ক্লটজবাখের মতে, চলতি বছর তৈরি হওয়া ঝড়গুলো দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকছে এবং দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের হিসাবে, আন্তর্জাতিক তারিখরেখার পূর্বাঞ্চলে ঝড়ের সম্মিলিত শক্তি পরিমাপের সূচক অ্যাকিউমুলেটেড সাইক্লোন এনার্জি (এসিই) আগের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। ২০১৮ সালে এই অঞ্চলে আগের রেকর্ড তৈরি হয়েছিল।
এল নিনো কীভাবে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বাড়াচ্ছে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই আবহাওয়াগত পরিস্থিতি বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরের বাতাসের প্রবাহ ও দিক পরিবর্তন করে। এতে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি কমিয়ে দিতে পারে এমন উল্লম্ব বায়ুপ্রবাহের বাধা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে প্রশান্ত মহাসাগরে ঝড়ের বিকাশ ও দীর্ঘস্থায়িত্বের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়।
এর পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকায় ঘূর্ণিঝড়গুলো অতিরিক্ত শক্তি পাচ্ছে। গবেষকদের মতে, এল নিনোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনও সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আটলান্টিক মহাসাগরে একই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের সক্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে। এল নিনোর প্রভাবে সেখানে এমন বায়ুপ্রবাহ তৈরি হচ্ছে, যা ঘূর্ণিঝড়ের বিকাশে বাধা দিতে পারে। অন্যদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে অনুকূল বায়ুপ্রবাহ, উষ্ণ সমুদ্র এবং বাতাসে বেশি আর্দ্রতা একসঙ্গে ঝড়ের সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলবিষয়ক গবেষক কিম উডের মতে, চলতি বছর প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চল উভয় অংশেই একযোগে অস্বাভাবিক সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে। সাধারণত একটি অংশে ঝড়ের তৎপরতা বাড়লে অন্য অংশে তা তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু এবার দুই অঞ্চলে একসঙ্গে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি ব্যতিক্রমী হয়ে উঠেছে।
এদিকে মধ্য আমেরিকার ওপর তৈরি হওয়া একটি বিশেষ বায়ুমণ্ডলীয় ঘূর্ণনপ্রবাহও ঝড় সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। এই প্রবাহ থেকে তৈরি হওয়া আবহাওয়াগত অস্থিরতা প্রশান্ত ও আটলান্টিক উভয় মহাসাগরেই ঘূর্ণিঝড় তৈরির অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
মেক্সিকোর উপকূলের কাছেও একটি নতুন ঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় হারিকেন কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেটি ক্রান্তীয় ঝড়ে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। অনুকূল আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে প্রশান্ত মহাসাগরে আরও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনো বৈশ্বিক আবহাওয়ার স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। এর প্রভাবে কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা, আবার কোথাও খরা ও তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ঘূর্ণিঝড়ের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)